ভিক্ষা লগ্ন

নীল's picture
নীল রবি, ২০২৬-০৭-০৫ ১৩:১৬

উপরওয়ালা তিন কেজির মন্ড তৈরী করে পাঠাবার সময় বলে দিয়েছিলেন,
”চিত্রগুপ্ত লেখো, নাম নীলমণি ভট্টাচার্য্য, মাতা-পিতা চন্দ্রা-নারায়ন ভট্টাচার্য্য,নিবাস আমতলা গলি, জন্ম তিথি চতুর্থী, ভিক্ষা লগ্ন। মা’ এর নাম চন্দ্রা, বাবার নাম নারায়ন চন্দ্র"।

কিন্তু এস আই আর এর ঠ্যালায় পড়ে চিত্রগুপ্ত ডিজিট্যাল কন্সপিরেসি করে বাবার নাম টাই করে দিল নারায়ন চন্দ্রা ভট্টাচার্য্য! সে যাই হোক বিধাতার অমোঘ বিধান মেনে নিয়ে আমি নীলমণি এখন একাধারে চন্দ্রা ও নারায়ন চন্দ্রার সন্তান। আর একটু বড় হতেই বিধাতার দ্বিতীয় ষড়যন্ত্র টা সম্পর্কে অবহিত হলাম।

এক দিন বাংলা ব্যাকরণের ক্লাসে আশিস বাবু দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “বাপি বল, চতুর্থী বিভক্তি কাকে বলে ?” কারক আর বিভক্তি আমার গুলিয়ে গু হয়ে যেত বরাবর। আমতা আমতা করে বললাম, “স্যার ওই তৃতীয়ার পরের টা আর কি!” স্যার বললেন, “অব্যর্থ বলেছো বাবা, কিন্তু এটা তো অংক ক্লাস নয়, একটু বুঝিয়ে বললে ভালো হয়।“
আবছা আবছা মনে পড়ল, কি যেন দেওয়া থোয়ার ব্যাপার ছিল একটা, দান না ডোনেশান গোছের কি যেন! অস্ফুটে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “স্যার কাউন্সিলার কে ভিক্ষা দাও টা হবে?” গোপালের বাবা আমাদের পাড়ার কাউন্সিলার ছিলেন। আপদে বিপদে চরিত্রপত্রে সই করাতে তাঁর কাছেই যেতে হত এবং তিনি কস্মিন কালেও ভিক্ষা চান নি। কিন্তু এলাকার একটা খেলার মাঠ সংস্কার করার জন্য উনি এলাকার জন সাধারন কে এগিয়ে আসতে অনুরোধ করে ছিলেন। এদিকে গোপাল ও আমার ক্লাস মেট, সে ক্লাসেই বসে ছিল। উদাহরণ শুনে সে রে রে করে তেড়ে উঠল। স্যার তখন ব্যাকরণ ছেড়ে ক্লাসের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আমায় কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকার আদেশ দিলেন। খানিক বাদে ক্লাস শেষের ঘন্টা পড়ে গেলে বেরিয়ে যাওয়ার সময় স্যার কানের কাছে আস্তে করে বলে গেলেন, “তোর উদাহরণ টা লজিক্যালি ঠিক হলেও নীতিগত ভাবে আপত্তিকর। সেই কারনেই শাস্তি দিতে হল"। এখন মনে হয় স্যার তো আর “পরিবর্তনের পরে” দেখে যান নি, তাহলে আর শাস্তি দিতেন না! কিন্তু উপলক্ষ্য তো সেটা নয়, চতুর্থী আর ভিক্ষা লগ্নের যৌথ ষড়যন্ত্রে আমার বাকি জীবন যে ক্রমে দুঃস্থ থেকে দুঃস্থতরো হয়ে ফুটে উঠবে তা তখন ই বোঝা হয়ে গিয়েছিল!

রবিন দা দাদার বন্ধু, কেকা দির উপর তার বিশেষ নজর ছিল। রবিন দা এলেই তার সাইকেল টা চাইতাম, শিখব বলে। সাইকেল চালাতে না শিখলে বাবা কিনে দেবে না। রবিন দা যতোক্ষণ কেকাদির সাথে গল্প গাছা করত, আমি রবিন দার সাইকেল টা নিয়ে মাঠে মক্স করতাম। হল কি আমার অত্যাচারে নাকি কেকাদি র আগ্রহ হীনতায় রবিন দা পাড়ায় আসাই ছেড়ে দিল। কেকাদি কে এই জন্য আজও ক্ষমা করে উঠতে পারি নি!

কৈশোরে বেলবটম বলে এক ধরণের প্যান্টের ছাঁদ বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল রাজেশ খান্না আর অমিতাভ বচ্চনের কল্যানে। আমরা সচরাচর চোঙা জাতীয় প্যান্ট পরতাম। কিন্তু বিরাট ঘের ওয়ালা তলায় চেন লাগানো বেলবটম তখন ক্রেজ। পুজোর সময় খুব আকাঙ্ক্ষা ছিল এমন একটা প্যান্ট বানানোর। কান চাপা চুল আর বেলবটমের কাতিল কম্বিনেশান বাবা কে বলার সাহস ছিল না। সরাসরি নাপিত গোপাল আর টেলার মাস্টার হর দার কাছে কত ভিক্ষা করেছি, ভুল করে চুলের আর প্যান্টের কাট বদলে দেওয়ার জন্য! কেউ কথা রাখে নি!

মোদ্দা কথা হল এই চাওয়া পাওয়ার ব্যালেন্স শীট আমার কোনদিনই মেলে নি। আর যদি বা কখনো অত্যাশ্চর্য্য ভাবে আশাতিরিক্ত কোন ক্রেডিট ব্যালেন্স কোন ভাবে জমা হয়েছে, অল্প সময়ের মধ্যেই তার ফলশ্রুতি তে পোড়া জীবন সুদের সুদ, সবৃদ্ধিমূল সমেত আমার খেরোর খাতায় আম-রক্তের অগোছালো আলপনা দিয়ে গেছে সূঁচাল তুলিতে।
জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে ভেবেছিলাম পুকুর চুরি করব! চুরি তো করবো কিন্তু তার আগে একটা পুকুর তো চাই। আমাদের বান্ধবীদের মধ্যে এক জনের পৈতৃক পুকুর সমেত বাগান বাড়ি ছিল, আমি জানতাম না। কিন্তু এই পুকুর চুরির পরিকল্পনাটা যাকে বলেছিলাম, সেও আমার খুব নিকট বন্ধু। সে দুই আর দুই এ চার করে একদিন আমায় সেই বান্ধবীর বাড়িতে নিয়ে গেল বিকেল বেলায়। লক্ষ্য করলাম, আমার প্রতি যত্নের আধিক্য টা যেন একটু মাত্রা ছাড়াই। গাওয়া ঘি এর লুচি আর সাদা আলুর তরকারি, পান্তুয়া সহযোগে খেয়ে সবে একটু আলস্য বোধ করছি। এমন সময় দেখলাম হারমোনিয়াম বেরোচ্ছে। মরা আলোয় আধো তেরছ্যা চাউনি তে বান্ধবী গান ধরল, “কতবার ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া।“ যে বন্ধুর আয়োজনে এই দুর্বিপাক, তার মুখের দিকে চেয়ে দেখি সেও চোখ বুঁজে মাথা নাড়ছে। আমি ভাবছি ছুটে পালালে ক্যামন দেখাবে, তবে কি এক পা এক পা করে দরজার দিকে এগোবো? অস্বস্তি বাড়ছে, ঘামে ঘাড় কপাল ভিজে যাচ্ছে। আমার অবস্থা দেখে বান্ধবীর মা’ই জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে বাবা?” আমি ঢোঁক গিলে বললাম, আসলে একটু ইয়ে মানে ও কিছু না মাসিমা। উনি বললেন “না না তোমরা বরং ছাতে গিয়ে গল্প কর। এখানে খুব গরম"। আমি দেখি আমাদের বান্ধবী হারমোনিয়াম ফেলে একটা হাত পাখা নিয়ে ছাতে উঠছে! সে কি ধর্ম সংকট, আমি ছাতে উঠবো না, আর আমায় ছাত না দেখিয়ে কিছুতেই ছাড়া হবে না! আয়জোক বন্ধু কে বললাম, ছাত থেকে লাফিয়ে যদি আমি আত্মহত্যা করি, তুই দায়ী থাকবি। বেয়াদপ চাঁদ ও সেদিন যেন একটু তাড়াতাড়িই উঠেছিল।

এর পরে সেই বান্ধবীর সাথে আর যোগাযোগ রাখা সম্ভব হয় নি। শুনেছিলাম আমরা যখন গ্রাজুয়েশানের অন্তিম পর্বে, তখন তার নাকি বিয়ে হয়ে গিয়েছিল এক কোটিপতির সাথে।বিয়েতে মেয়ের বাবা, পুকুর সমেত বাগান বাড়ি মেয়ে কে যৌতুকে দিয়েছেন প্রতিশ্রুতি মত। হোস্টেলে থাকা কালীন কত কত দিন আর রাত বাসব আর সুজয়ের সাথে পুকুর পাড়ে বসে তাড়ি সহ সাঁওতালি গান আর বাঁশি শুনতে শুনতে ভেবেছি, এই পুকুর টা কি চুরি করা যায়, না কি খেসারত দিতে হবে ধরা পড়লে।

__________________

নিরক্ষর

হলুদ's picture
অনবদ্য

হলুদ 1 সপ্তাহ 4 দিন আগে

অনবদ্য

m.c.'s picture
Excellento

m.c. 1 সপ্তাহ 3 দিন আগে

Excellento

এনা's picture
দারুণ নীলদা

এনা 1 সপ্তাহ 2 দিন আগে

দারুণ নীলদা

কাপাসতুলো's picture
‘জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে

কাপাসতুলো 1 সপ্তাহ 2 দিন আগে

‘জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে ভেবেছিলাম পুকুর চুরি করব! চুরি তো করবো কিন্তু তার আগে একটা পুকুর তো চাই।’

great men think alike Laughing out loud

পৃথা's picture
জীবনের গতিপথ বিচিত্র যাইহোক,

পৃথা 1 সপ্তাহ 2 দিন আগে

জীবনের গতিপথ বিচিত্র
যাইহোক, পড়তে বেশ লাগল

ঝর্না's picture
সুপার সে উপর এমন গদ্য

ঝর্না 5 দিন 10 ঘন্টা আগে

সুপার সে উপর Smile
এমন গদ্য লেখাগুলো দূর্দান্ত লেখেন আপনি।

kranti's picture
উপভোগ্য

kranti 5 দিন 4 ঘন্টা আগে

উপভোগ্য

শ্রীহরি গলগ্রহ's picture
হক কথা! করতে হলে পুকুর চুরিই

শ্রীহরি গলগ্রহ 4 দিন 22 ঘন্টা আগে

হক কথা! করতে হলে পুকুর চুরিই করা উচিত!



নতুন মন্তব্য পাঠান

  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <b> <font color> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <small>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • You may use [inline:xx] tags to display uploaded files or images inline.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.
  • You may use <swf file="song.mp3"> to display Flash files inline