বটবৃক্ষ: পর্ব তিন

পাশাপাশি দুটো খবর। প্রথমটা ফলাও করে তার শহরে নব নির্মীয়মান হাইওয়ে আর সন্নিহিত অঞ্চলের শপিংমল সহ উন্নয়নের প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হওয়ার খবর, বিধায়ক আর নগরপালিকার তরফ থেকে নাগরিকদের অভিনন্দনের হুড়োহুড়ি আর পাশেই দ্বিতীয় খবরটা। মহারাষ্ট্রের সুপরিচিত পরিবেশবিদ আবেশ খেমকারকে কে বা কারা গতকাল তার বাড়ির সামনের পার্কে সন্ধ্যাবেলা খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করেছে ! ইদানিং তিনি একটা পরিবেশ আন্দোলনের প্রতিবাদের মুখ হয়ে উঠেছিলেন। বিখ্যাত শিল্পগোষ্ঠী বুরুচাদের মহারাষ্ট্র প্রদেশের সবুজ বনাঞ্চল ধ্বংস করে কারখানা স্থাপনের জন্যে বৃহৎ অন্তরায় হয়ে উঠেছিলেন। পেপারটা হাতে নিয়ে বসে রইলেন আলোকরঞ্জন,অনেক ক্ষণ, চুপচাপ। তারপর উঠলেন, নিতান্ত কি এক ঘোরের মধ্যে পার্কের দিকে চলতে শুরু করলেন, পিতামহের কাছে যাবেন, যেতে হবে, যদিও কি বলবেন সেটা তিনি জানেন না। তিনি হেরে যাচ্ছেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই পশুশক্তির অভ্ৰংলেহী আস্ফালন তাকে ভীত করেছে, তার, শুধু তার কেন, শুভবুদ্ধির, নৈতিকতার এই যুদ্ধের সমস্ত সৈনিককুলকে নিদারুন আঘাত করেছে, মেরুদন্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কাল ভেবেছিলেন যে তিনি একবার স্থানীয় বিধায়কের কাছে যাবেন, বুঝিয়ে বলবেন এই পার্কের আর তার সাথে এই বয়োবৃদ্ধ বটগাছের অসীম গুরুত্বের কথা, চেষ্টা করবেন জনমত সংগ্রহ করার। লিখবেন কাগজে, দরকার হলে বসবেন ধর্নায়। কিন্তু আজকে এই সংবাদ তার সমস্ত প্রচেষ্টার গোড়া ধরে নাড়িয়ে দিয়েছে। যুদ্ধের আগেই যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। পিতামহের কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইবেন, বলবেন "ক্ষমা করো পিতামহ, আমি পারলাম না!" বলবেন তিনি একান্ত একা, এই অসম যুদ্ধে অশক্ত তার পাশে কেউ নেই। এই বিষাক্ত বিশাল অপশক্তির সামনে তিনি একেবারে একা।
অনেক ভেবে তিনি ঠিক করলেন, তিনি হাল ছাড়বেন না, তার দ্বারা যতখানি হয় দেখবেন। কাল একবার স্থানীয় বিধায়কের কাছে যাবেন, সকালে বিকেলে একবার পার্কে বেড়াতে আসা লোকজনের সাথে কথা বলবেন এ ব্যাপারে। তিনি ইন্টারনেটে গিয়ে এই নির্মীয়মান ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান আর সে সংলগ্ন হাইওয়ের সম্পর্কে যতখানি পারেন খোঁজখবর শুরু করলেন। বেশ কয়েক আপলোড আছে দেখতে পেলেন, কে কে এই ডেভেলপমেন্টের স্টেকহোল্ডার বা অংশীদার তার তালিকা দিয়েছে। দেখতে দেখতে একটা বিশেষ ব্যাপার তার চোখে পড়লো। দেখা গেলো, একটা পুরোনো আপলোড বলছে, হাইওয়েটার পজিশন বেশ কয়েকবার চেঞ্জ হয়েছে। প্রথমে সেটা ছিল পার্ক থেকে বেশ খানিকটা দূরে। পোদ্দার ঠিকই বলেছিলো, নেহাত ব্যবসায়িক সুবিধার্থে সেটাকে আরো অনেকখানি ডান দিকে বাঁকিয়ে এনে পার্কের ওপর দিয়ে ঘোরানো হয়েছে। যাই করা হোক, এখন যে প্ল্যানটা করা হয়েছে, সেটা নিয়মানুগ ভাবে এপ্রুভড আর পাবলিকলি প্রকাশিত। কাজেই কারোর কিছু বলার নেই।
ওহ, এখন আলোকরঞ্জন বুঝলেন, এই জন্যে ওই স্যান্ডি নামে কমেন্টর বলেছিলো, যত আগে এসব ব্যাপার সম্ভব তাদের জানাতে। আগে জানলে তবু কিছু চেষ্টা করা যেত, ব্যাপারটা ডিল করা হয়তো সহজ হতে পারতো। এখন যখন মাস্টার প্ল্যান এপ্রুভ হয়ে গেছে, ঘোষণা হয়ে গেছে, তখন কতখানি কি করা যাবে অথবা আদৌ কিছু করা যাবে কিনা সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। ক্লান্ত আলোকরঞ্জন চশমাটা খুলে টেবিলে রাখতেই গদাই এসে বললো, "দাদা, ওঠো, টেবিলে খাবার দেওয়া হয়েছে।"
রাতের খাবার খেয়ে বাইরের বারান্দায় এসে বসলেন অলোকরঞ্জন। মেঘ তেমন নেই, তারা ভরা আকাশ নির্নিমেষ চেয়ে আছে মনে হয় পৃথিবীর দিকে, সহস্রাক্ষু হয়ে দেখছে পরমা প্রকৃতির সৃষ্ট এই অপরূপ জগৎসংসার। ছোটবেলায় শুনতেন, মানুষ মরে গেলে আকাশের তারা হয়ে যায় ! কোথা থেকে যে এই অদ্ভুত কথাটা এসেছে মানুষের মনে কে জানে ! তারা যেমন দেখা যায় কিন্তু ছোঁয়া যায়না, ধরা যায়না, প্রিয়জন মারা গেলে সেও কি ঐরকম মনের দর্শনে থাকে,স্মৃতি হয়ে, কিন্তু তাকে ছোঁয়া যায়না ? নাকি সত্যি এর কোনো মানে আছে, যা কোনোকালে মানুষ জানতো, এখন ভুলে গেছে ? অন্নপূর্ণা কি ঐখানে কোথাও তারা হয়ে তাকে এখন দেখছে ? কে জানে ! আসলে মানুষ কিছুই জানেনা, কিচ্ছু না। ইউনিভার্স কি করে সৃষ্টি হলো সে জানা নেই, কেন সৃষ্টি হলো সে জানা নেই, কে সৃষ্টি করেছে, কোথায় কোন মহাশূন্যে ভাসছে, সে মহাশূন্য অসীম না সসীম ,কত তার ব্যাপ্তি, সংকুচিত হচ্ছে না প্রসারিত হচ্ছে - কিচ্ছু জানা নেই। প্রাণ কি করে সৃষ্টি হয়, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাইরাস থেকে বৃহৎ নীল তিমি কোন প্রাণ শক্তিতে চলে ফিরে বেড়াচ্ছে, তা জানা নেই ! সবচেয়ে বড় কথা, প্রাণ সৃষ্টির উদ্দেশ্য কি সেটাই মানুষ জানেনা। মানুষ জানেনা, পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা থেকে এই বিশাল মহাবিশ্ব কি করে এক আশ্চর্য্য ছন্দে, নিখুঁত অঙ্কে স্পন্দিত হচ্ছে। সব অঙ্কে বাঁধা, একটুও এদিক ওদিক হবার যে নেই। তার মধ্যে আবার প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যে কি অপরূপ আনন্দে ললিতকলার চরমকে বিধৃত করে দেওয়া হয়েছে । অসীম মহাবিশ্ব থেকে কোয়ান্টাম ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র, কেউ সেই সৌন্দর্য্য থেকে বঞ্চিত হয়নি ! ক্ষুদ্র মানুষ কিন্তু তার এই সীমিত সামর্থ নিয়েই প্রথম দিন থেকে এই বিশাল সৃষ্টিকে জানার প্রানপন চেষ্টা করে গেছে। সামান্য কিছু জেনেছে, বেশিটাই জানেনি। তাদের মধ্যে আবার যুগে যুগে যেমন জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় কল্যাণময় পথপ্রদর্শক এসেছে, তেমনি এসেছে চরম ক্ষতিকারক বিষাক্ত গণশত্রু। হয়তো তাদেরও দরকার ছিল, উঁচু ক্লাসে উঠতে হলে প্রশ্নপত্র আর পরীক্ষাও ততো কঠিন হবে, হতেই হবে। হঠাৎই মনে পড়লো, অনেক ছোটবেলায় বাড়িতে দেওয়ালে একটা ক্যালেন্ডার দেখেছিলেন। কুরুক্ষেত্র রণভূমিতে নিদারুন যুদ্ধের দৃশ্য, পটভূমিতে আকাশ ভীষণ লাল আর কালো রঙে ভয়ঙ্কর, চতুর্দিকে মৃত আর আহত, মুণ্ডহীন শবের মধ্যে, ভূমিতে রথের চাকা দু হাতে মাথায় তুলে প্রহারে উদ্যত স্বয়ম কৃষ্ণ, চোখে দুরন্ত ক্রোধ, আর মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে ভীষ্ম স্তব করছেন শ্রীকৃষ্ণের সামনে।
মনে পড়লো, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণের অস্ত্র না নেওয়ার প্রতিজ্ঞা ভাঙার জন্যে ভীষ্মকে সেদিন সেইরকমই ভয়ানক ধ্বংসাত্বক যুদ্ধ করতে হয়েছিল। প্রকৃতির ওপর মানুষের এই ভয়ানক অত্যাচারে হয়তো একদিন স্বয়ং প্রকৃতিই নিজের হাতে মানুষের ছদ্মবেশ ধরা এই দানবের সংহারে হাতে অস্ত্র তুলে নেবেন। মাথার ওপর থেকে সরে যাবে আকাশের রক্ষাকবচ, করুণাময় সূর্যদেব ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে উগরে দেবেন মালসা মালসা আগুনের হলকা ! পোড়া কাগজের মতো একপ্রান্ত থেকে কালো হয়ে গুটিয়ে যাবে আকাশের চাঁদোয়া ! ফুৎকারে নিঃশেষ হবে বাতাস, নিশ্বাস নেওয়ার জন্য পৃথিবীতে থাকবেনা একটুও হাওয়া, কোথাও থাকবে না পান করার জন্য এক ফোঁটা জল ! শেষের সেদিন আসবে বড় ভয়ঙ্কর বেশে, ওই ছবির মতো, প্রেক্ষাপটে থাকবে সেদিনের রক্তবর্ণ ধুম্রলোচন বজ্র বিদ্যুৎ সমাকীর্ণ আকাশ, লক্ষ লক্ষ ইতস্তত বিক্ষিপ্ত মানুষের শব, থকথকে গলিত লাভাপুঞ্জ অথবা রুধির রঞ্জিত মানুষের বধ্যভূমি আর থাকবে আকাশ ফাটানো বাতাস ঘোলানো সব কিছু হারানোর লক্ষ-বক্ষ-বিদীর্ন হাহাকার ! মহামায়া সেদিন নিস্করুণ ভয়ঙ্করী মহাকালী হয়ে নিজ হাতে ভুল সংশোধন করবেন ! সেদিন তার পায়ের নীচে, সত্য শিব সুন্দর থাকবেন পড়ে অচেতনে, অসহায় ! সর্বগ্রাসী কালী করালি, মহাকালী ধূমাবতী অগ্নিপিণ্ডউদ্গারী লোলজিহ্বা দিয়ে গ্রাস করবেন মানুষের সমস্ত বুদ্ধি আর সভ্যতার ঠুনকো অহংকার, সমস্ত সাজানো মিথ্যে সংসার ! তোমাদের এই সাধের সভ্যতার ছদ্মবেশী দানবের মুন্ড নিয়ে দাউদাউ করে জ্বলা শ্মশানে নেচে বেড়াবেন ! সাবধান হও, ক্ষুদ্র মানুষ, অহংকারী লোভী নৃশংস হিংসুক, ক্রূর মানুষ, এই গ্রহের সবচেয়ে বড় খলনায়ক, দেরি হয়ে যাচ্ছে, খুব দেরি হয়ে যাচ্ছে, সময় প্রায় নেই, এখনো সাবধান হও !
আলোকরঞ্জন ঘরে ফিরে এসে ল্যাপটপটা খুলে মেইলবক্সে গেলেন। কাঁপা কাঁপা হাতে মেইলটা টাইপ করতে আরম্ভ করলেন, "ডিয়ার স্যান্ডি, আমি গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ওপর আপনার কমেন্ট দেখে আপনার সাথে যোগাযোগ করছি। জানিনা আমি দেরি করে ফেলেছি কিনা, কিন্তু 'বেটার লেট দ্যান নেভার'। আমার বাড়ি ইন্ডিয়ার ওয়েস্ট বেঙ্গলের ------"
পর্ব -চার
আলোকরঞ্জনের ভীষণ গরম লাগছে, রগের কাছটা দপ দপ করছে, চোখের কোন দুটো শুকিয়ে জ্বালা করছে, কান দুটো দিয়ে মনে হচ্ছে আগুনের হলকা বের হচ্ছে। তিনি বুঝলেন তার এত দিনের সযত্ন লালিত শিক্ষাদীক্ষা, সংস্কার, সংযম, ভদ্রতা, শালীনতাকে অতিক্রম করছে তার দুরন্ত ক্রোধ। ভেতরে ভেতরে তা আগ্নেয়গিরির গলিত তপ্ত লাভার মতো ফেটে পড়তে চাইছে, থর থর করে কাঁপছে তার শরীর। অনেক কষ্টে, বহু প্রয়াসে তিনি নিজেকে সংযত করে বেরিয়ে এলেন গগন সামন্তর অফিস থেকে। এটা তার আগেই বোঝা উচিত ছিল। শুধু স্থানীয বিধায়ক গগনবিহারী সামন্ত কেন, সম্ভবত এই অশুভ আঁতাতের জাল আরো বহু বহু অনেক উঁচু অবধি ছড়িয়ে, এবং তা অনেক দিন আগে থেকে, অত্যন্ত পরিকল্পিত ভাবে।
সকাল আটটা থেকে অফিসে বসিয়ে রেখে সামন্তর এগারোটার সময় তাকে পাঁচ মিনিট টাইম দেওয়া আর কথার মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে দশবার ফোন আর চামচেদের সাথে ফালতু ব্যাপারে ব্যস্ত হয়ে যাওয়া দেখেই বোঝা গেল যে এই সমস্ত কথার কোনো মূল্যই তার কাছে নেই। কথার শেষে মোটা সোনার চেন আর একগাদা লাল সুতো বাঁধা গোব্দা বাম হাত নেড়ে মাছি তাড়ানোর মতো করে সামন্ত বললো, "এ ব্যাপারে আমার কিছুই করণীয় নেই স্যার, সরকারের প্রজেক্ট, অনেক বড় বড় লোক, মাথা ঘামিয়ে, উচিত অনুচিত বিবেচনা করেই অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে অনেক লোকের রুজি রোজগারের ভাবনা পরিকল্পনা করা আছে, বিশ্বব্যাংকের বড় বড় মাথা, কেন্দ্রীয় আর রাজ্য সরকারি অফিসার একত্র বসে, ভাবনা চিন্তা করে জনগণের মঙ্গলের জন্যেই এই প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। কাজেই আপনি যা বলছেন, সত্যি করে বলতে কি, আবার বলছি, আমার কিছুই করার নেই। ঐ বটগাছটার জায়গায় যদি লোকের বসতিও থাকতো, তাহলেও কিছু করার ছিলোনা। মানুষ হলে অন্য কিছু করার ছিল মানে পুনর্বাসন বা ক্ষতিপূরণ আর কি ! কিন্তু বটগাছ তো আর মানুষ নয় যে তাকে পুনর্বাসন বা ক্ষতিপূরণ দেওয়া যাবে ! আচ্ছা এখন স্যার আমাকে একটু উঠতে হবে, আপনি মানে --" এই বলে চেয়ার ছেড়ে হাত জোড় করে নমস্কারের ভঙ্গি করে সামন্ত।
আলোকরঞ্জন তার কথার খেই ধরেই বলতে যাচ্ছিলেন যে "ঠিক তাই, বটগাছ লোভী মানুষ নয় যে তাকে মোটা ক্ষতিপূরণ দিয়ে বশ করা যাবে, অন্যত্র ঘুপচি ইঁদুরের গর্তের মতো ফ্ল্যাট বানিয়ে পুনর্বাসন দেওয়া যাবে ! সে প্রতিবাদ করতে পারে না বলে নিজেদের লোভের কাঠগড়ায় তাকে নির্বিবাদে বলি দেওয়া যাবে !" কিন্তু তাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই গগন সামন্ত হাঁচোড়পাঁচর করে ভারী শরীরটা চেয়ারের ওপর থেকে নিয়ে টেনে তুলে উঠে দাঁড়ালো, হাতজোড় করে বললো, “তাহলে স্যার এবার মানে, বুঝতেই পারছেন, অনেকে অপেক্ষা করে আছে, বুঝলেন কিনা !” সোজা কোথায় আপনাকে অনেক সময় দেওয়া হয়েছে, এবার মানে মানে আপনি আসুন।
তবু আলোকরঞ্জন একটু জোর করে কিছু বলতে আরম্ভ করতেই গগন সামন্ত তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে পাশের চ্যাংড়া মস্তান টাইপের ছেলেটিকে হাত নেড়ে যা বললো তাতে আলোকরঞ্জনের মনে হলো, তার এখানে আসাটাই অত্যন্ত অন্যায় হয়েছে, কমসে কম যেচে এই অপমানটা হতো না। পাশের চ্যাংড়া ছেলেটিকে সামন্ত বললো, "এই বুলেট, দাদুকে ধরে একটু বাড়ি অবধি ছেড়ে দিয়ে আয় তো, দাদুর শরীরটা মনে হচ্ছে ভাল নেই !" এই বলে খুব দ্রুত একটা চোখের ইশারা, সোজা বাংলায়, চোখে কার্নিক মেরে বুঝিয়ে দিল যে এটা তার ফাইনাল কমেন্ট এবং এ ব্যাপারে আর একটি কথাও সে বলতে রাজি নয়। বুলেট নামের ঘাড়চুলো ছেলেটি খ্যাক খ্যাক করে হেসে "চলুন তো দাদু, কদ্দুরে থাকেন ?" বলে এগোতেই আলোকরঞ্জন উঠে পড়েন। বেরিয়ে আসতেই পেছনে সামন্তের হাসির সাথে মন্তব্য কানে আসে। "দাদুকে চিনলি না ? ওই যে পার্কের ধারের সাত মহলা বাড়িটা - যেখানে মলটা হবে, আরে ওই যে পোদ্দার নিচ্ছে যেটা, এই সব বটগাছ টাছ ফালতু কথা, আসলে ---" আলোকরঞ্জন আর বাকিটা শোনার জন্যে দাঁড়ালেন না। কি অপরিসীম স্পর্ধা ! এই লোকগুলো অলরেডি ধরে নিয়েছে যে তার বাড়িটা ভেঙে মল হচ্ছে ! তার ইচ্ছে অনিচ্ছের কোনো মূল্যই এখানে নেই !
আজ সকাল থেকেই আলোকরঞ্জনের শরীর খারাপ লাগছে। রাতে ভালো ঘুম হয়নি তার। সকালে উঠে কালকের ব্যাপারটা মনে পড়তেই তার নিজেকে অত্যন্ত অসহায় লাগলো। নিজেকে তার ফাঁদে পড়া কিংকর্তব্যবিমূঢ় বৃদ্ধ সিংহ মনে হলো। গোটা জীবন তিনি এই এলাকায় সসম্মানে মাথা উঁচু করে চলেছেন। অসংখ্য ছাত্র ছাত্রী তার দেশে বিদেশে ছড়িয়ে, নানা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত, একসময় তাকে দেখে রাস্তায় সিগারেট লুকোত, মাথা ঝুঁকিয়ে নমস্কার আসতো, অবক্ষয়ী দীর্ণ সমাজ তার অবশিষ্ট শ্রদ্ধাটুকু নিয়ে সসংকোচে মাথা নামিয়ে তাকে পথ ছেড়ে দিতো। কিন্তু আজ তার অজ্ঞাতে সেই শ্রদ্ধা, বিনম্রতা, সম্মানের ভিত ক্ষয়ে গিয়ে স্বার্থান্ধ জীবনচর্যার বেনোজল এতদূরে ঢুকে শিক্ষা দীক্ষা সংস্কারের ইমারতকে ধ্বসিয়ে দিয়েছে সেটা যেন নতুন করে দেখতে পেলেন। কি এক হারানোর যন্ত্রনা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। গদাই এসে যখন জিজ্ঞেস করলো যে আজ তার কোথাও বেরোবার প্ল্যান আছে কিনা, তখন তিনি বেশ খানিকক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন শূন্য দৃষ্টিতে। যেন আপ্রাণ চেষ্টা করছেন নিজেকে নিজের মধ্যে ফেরাবার।
গদাই উদ্বিগ্ন মুখে কাছে এসে গায়ে হাত দিয়ে দেখল, বললো, "কি হয়েছে বলতো দাদা, ক’দিন হলো তোমার শরীর গতিক যেন মোটেই ভালো নেই ? ডাক্তারদাদাকে খবর দেব ? পেসার মেসিন তো ঘরেই আছে, দেখোনা কেন, পেসার উঠলো নামলো, কি কেমন আছে, সিগারেটটাও তো বেশি খাচ্ছ দেখছি কদিন ?"
আলোকরঞ্জন নিজে মনেই বলে উঠলেন, "পেসারের আর কি দোষ, যত দোষ তোর এই বুড়ো দাদার ! নাহ, আজ আর কোথাও বেরোবার নেই।"
গদাই নিশ্চিন্ত না হলেও সাময়িক স্বস্তি পেলো। আলোকরঞ্জন জানেন যে অন্নপূর্ণার পর আর কেউ যদি তার সবচেয়ে খেয়াল রাখে সে হলো গদাই। আজ নয়, বহু বছর ধরে গদাই আর তিনি একে ওপরের অবিচ্ছেদ্য পরিপুর হয়ে উঠেছেন। ভাইয়ের মতো, সখার মতো, একে অপরকে জড়িয়ে বেড়ে ওঠা দুটি বৃক্ষের মতো। তার দুটি চোখ অজান্তে কোমল হয়ে এলো।
গদাইকে ডেকে বললেন, "গদাই আজ বাজারে গিয়ে দেখতো ভালো মাছ কি পাস, আর হিং দিয়ে একটু ধোঁকার ডালনা কর না, অনেক দিন খাইনি !" এবার গদাইয়ের মুখে হাসি ফিরে এলো। আলোকরঞ্জন জানেন গদাই কে আশ্বস্ত করার পন্থা, স্বস্তি দেবার রাস্তা।
আলোকরঞ্জন একটু দেরি করে ব্রেকফাস্ট করে তার প্রিয় ইজিচেয়ারে বসে ইংরেজি পেপারটা দেখছিলেন। রাতের ঘুমটা ভালো না হওয়ায় একটু তন্দ্রা মতো এসে গিয়েছিল। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠতে আলোকরঞ্জন ইজিচেয়ার থেকে হাত বাড়িয়ে টেবিলের ওপরে রাখা ফোনটা ধরলেন। চশমাটা নেওয়ার আগেই টাচ স্ক্রিনে আঙ্গুল লেগে ফোনটা অন হয়ে গেল।
একটু খিলখিল হাসির সাথে উল্টো দিক থেকে রিনরিন করে উঠলো একটা গলা, "হাই সুইটহার্ট, হাউ আর যু ডুইং ?"



রেবতী 3 সপ্তাহ 1 দিন আগে
গতকালই পড়ছিলাম, কাহিনী চমৎকার এগোচ্ছে, পড়তে ভাল লাগছে
m.c. 3 সপ্তাহ 1 দিন আগে
Excellento
kalyan 3 সপ্তাহ 1 দিন আগে
কাহিনীর প্লট সমসাময়িক ও প্রাসঙ্গিক
সুতরাং আরো বেশি করে রিলেট করতে পারা যাচ্ছে
নিয়মিত কিস্তিগুলো আসতে থাকুক
ঝর্না 3 সপ্তাহ 21 ঘন্টা আগে
দারুন এগোচ্ছে গল্প। পর্ব ২ ও ৩ দূর্দান্ত হলো।
ঝর্না 3 সপ্তাহ 20 ঘন্টা আগে
পূণের যে ঘটনার কথা শুরুতে উল্লেখ করলেন সেটা সত্যিই মর্মান্তিক ছিল। মর্নিং ওয়াকে গেছিলেন, আর সেখানেই....
গল্প লেখার অসাধারন দক্ষতা আপনার। ট্রুলি ব্লেসড।
পরেরটা আসুক।
ঝর্না 3 সপ্তাহ 20 ঘন্টা আগে
আপনার গল্পে ঘটনাটা সন্ধেবেলায়।
gb 2 সপ্তাহ 5 দিন আগে
সবাইকে অনেক আন্তরিক শুভেচ্ছা ! ঠিক, চলুক তাহলে বটবৃক্ষর গল্পকথা !
মধুছন্দা 2 সপ্তাহ 17 ঘন্টা আগে
পর্ব তিন মনোযোগ দিয়ে পড়লাম
পরের পর্বর জন্য ইন্তেজার থাকল
পম 2 সপ্তাহ 17 ঘন্টা আগে
গল্পটি জমাট ও দুর্দান্ত এগোচ্ছে
টুইস্টস্ অ্যান্ড টার্নসের দিকে নজর রাখব অবশ্যই
অনিমেষ দত্ত 2 সপ্তাহ 16 ঘন্টা আগে
অতুলনীয় গল্পদক্ষতা
gb 2 সপ্তাহ 4 ঘন্টা আগে
সবাইকে অনেকানেক আন্তরিক ধন্যবাদ ! পাঠকের তৃপ্তিতে গল্পের সার্থকতা - সবাই ভাল থাক ! আজ চার পাঁচ পর্ব দেওয়া গেল ! কেমন এগোচ্ছে জানতে পারলে খুব ভাল লাগবে !
নতুন মন্তব্য পাঠান