বটবৃক্ষ

আজ সন্দীপনের গল্পের শেষ পর্ব বাকি থাকুক, আজ আরেক নতুন গল্প : গল্পের নাম বটবৃক্ষ, গল্প ভাল লাগলে পরের পর্বগুলো দেওয়া যাবে !
(এ বড় সংকীর্ণ কাল
বিষের বিষম জাল
- নির্বাক হিসেবে চায়
শ্মশান-চণ্ডাল -
হিংসা হিংস ধর্মাধর্ম
বোকা এই সিংহ চর্ম
লোভে পাপে গড়া বর্ম
লালসার ঢাল
পুড়ে যায় জ্বলে যায়
আদমের পুত্র হায়
আবেলের রক্তে ভেজা
প্রত্যেক সকাল !)
পর্ব এক
আলোকরঞ্জন পার্কের ধারের দিকে ধীরে ধীরে গাছটার প্রকান্ড গুঁড়িটার পাশে এসে দাঁড়ালেন। আস্তে আস্তে বটগাছটার মোটা কান্ডটার গায়ে পরমসুহৃদের মতো স্নেহভরে হাত রাখলেন। ফেব্রয়ারির দুপুর বেশিক্ষন থাকেনা, বিকেল তো আরো কম। দিনটা মেঘলা ছিল, পশ্চিমের আকাশে একটা বিষণ্ণ গেরুয়া ঘেঁষা আলো, যেন বৃদ্ধ সূর্যদেব গৈরিক বসন গায়ে জড়িয়ে নিয়ে সন্ধ্যাহ্নিকে বসার আয়োজন করছেন। এই সময়ে বিকেলের দিকে কেমন একটা মন খারাপ করা হাওয়া দেয়। ঠান্ডা বা গরম নয়, কিন্তু হাওয়ায় একটা অদ্ভুত নিরাসক্তি খেলা করে। যেন কানে কানে বলে যায়, এই জগতের কিছুই স্থায়ী নয়, সব কিছু অনিত্য, সবের শেষ আছে, সব্বাইকে সব কিছু ছেড়ে একদিন যেতে হবে। সকলে এখানে দুদিনের অতিথি মাত্র। বিশাল বটগাছটা ওই মৃদু হাওয়াতেই সর সর শব্দ করে উঠলো, আলোকরঞ্জনের মনে হলো গাছটা যেন কথা বলে উঠলো। খুব চেনা স্বর, কত বছর ধরে শুনছেন যে এই বটবৃক্ষের আলাপ। সকাল, দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যে আর রাত্রিতে, গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্তে, শীত বসন্তে, সুখে, দুঃখে, মৌন, মুখরে ! কথাগুলো ধরি ধরি করে ধরতে পারছেন না আলোকরঞ্জন ! উৎকর্ণ হয়ে ভালো করে শোনার চেষ্টা করলেন, যেন একটু কান করে শুনলেই বোঝা যাবে। কিছু তো বলছেই। বোধ হয় বুঝতে পেরেছে যে সভ্যতার এই চতুর্থ সন্তান, ঈশ্বরের সৃষ্টির সবচেয়ে বড় ভুল, এই মানুষ নামের অর্বাচীন দুর্বিনীত অকৃতজ্ঞ জীব তার নিজস্ব আদালতে একতরফা ডিক্রী জারি করেছে তার জীবনের ওপর, বিনা দোষে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে এই বিশাল বয়োবৃদ্ধ ভীষ্ম পিতামহকে। মনে হলো, শেষের সে দিন সমাগত জেনে তবুও এই বটবৃক্ষ তার নিজস্ব ভাষায় অস্তগামী সূর্য্যদেবকে দিনের শেষ প্রণতি জানাল, তার সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে জগতের মঙ্গল কামনা করলো।
গাছটার গায়ে আবার হাত বোলালেন আলোকরঞ্জন, মাথা নুইয়ে বিড়বিড় করলেন, "হ্যাঁ, তুমি ঠিকই শুনেছ, আজ সকালেই মিউনিসিপ্যালিটির ডিসিশন হয়ে গেছে, তোমার মৃত্যু পরোয়ানা জারি হয়েছে, প্রকৃতির দেওয়া তোমার অধিকারকে পায়ের তলায় মাড়িয়ে তোমার মৃত্যুভূমির ওপর দিয়েই ছুটবে মানুষের সভ্যতার রথ, নিজস্ব স্বার্থের ঘূর্ণ্যমান চাকাগুলো, তৈরি হবে সিক্স লেন হাইওয়ে। আরও পণ্য, আরও উপচার, আরও লাভ, আরও টাকা, আরও আরাম, আরও ভোগ, আরও, আরও অশান্তি, আরও পাপ, উন্নতির ছদ্মবেশে চোখে কাপড় বেঁধে সীমাহীন লালসাময় অন্ধকারের দিকে আরও জোরে ছুটে চলা।"
একটা বড় দীর্ঘ্যনিশ্বাস বেরিয়ে এলো আলোকরঞ্জনের বুক থেকে। অশক্ত পায়ে অত্যন্ত ধীরে গাছটার কাছ থেকে দূরে সরে এলেন আলোকরঞ্জন। আকাশের আলো তখন প্রায় নিবে এসেছে। পকেটে হাত ভরে সিগারেটের প্যাকেটটা নিতে গিয়ে হাতে ঠেকলো মোবাইলটা। তখনি মনে পড়লো তার অবস্থাও এই বটবৃক্ষের মতোই। দুই ছেলেই আসছে, একজন আমেরিকা আর একজন ব্যাঙ্গালোর থেকে। বোধ হয় বুঝেছে যে আলোকরঞ্জনের দিন ফুরিয়ে এসেছে। সময় থাকতে থাকতে এতো বড় পৈতৃক বাড়িটার সদ্গতি করে ফেলতে হবে। সদ্গতি ! হুঁ, সদ্গতিই তো। কেন যে আজ সকালেই মর্নিং ওয়াক করার সময় বিনয় পোদ্দার রাস্তায় যেন দৈবাৎ দেখা হওয়ার ভান করে গায়ে পড়ে "কেমন আছেন প্রফেসর সাহাব" বলে, সেটা বুঝতে পঁচাত্তরের রিটায়ার্ড ম্যাথমেটিক্স প্রফেসর আলোকরঞ্জনের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। প্রোমোটার বিনয় পোদ্দার প্রথম তার লোভের ঝোলা নিয়ে এসেছিলো প্রায় বছর খানেক আগে। তিনি তাকে তখন পত্রপাঠ ভাগিয়ে দিয়েছিলেন। ছেলেদের ফোন নম্বর জোগাড় করা, ও সব প্রোমোটারদের বাঁ হাতের খেল। তারপর তিনি কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার সময় তো চিকিৎসার সুবিধার্থে অনেককেই ছেলেদের ফোন নাম্বার দিয়েছিলেন।
ইদানিং মাস দুয়েক আগে পোদ্দার প্রোমোটার আবার এসেছিল একটা ষণ্ডা মতো চ্যালা নিয়ে সকালের দিকে। বাড়ি বয়ে, ঘন্টাখানেক ধরে অমার্জিত বাংলা, হিন্দি আর অশিক্ষিত ইংলিশের জগাখিচুড়িতে বুঝিয়েছিল তার "পেলানটা কি আছে !" লোকটা অলমোস্ট ধরেই নিয়েছে যে বাড়িটা জমি সমেত আলোকরঞ্জন দিয়ে দিচ্ছেন। একতরফা ভাবেই বকে যাচ্ছিলো, বোঝাচ্ছিলো তার বাড়িটা নেওয়া কেন তার কাছে এতো ইম্পরট্যান্ট ! এতো দুঃখের মধ্যেও আলোকরঞ্জনের হাসি পেলো, ওই সাত সকালে মুখের মধ্যে রেডিমেড পান গুটখা ভরে, অশিক্ষিত পোদ্দারের মুখে হিন্দির অনুকরণে অশুদ্ধ বাংলায় "ইম্পরট্যান্ট" শব্দটা কি হাস্যকর শোনাচ্ছিল। পান গুটখার গন্ধ, আর থুথু ছেটাতে ছেটাতে এক কথা পঁচিশবার রিপিট করে বুঝিয়েছিল তার বাড়ির লোকেশনাল অ্যাডভান্টেজ। পার্কের কান ঘেঁষে তার বাড়ির যা অবস্থান তা একেবারে যাকে বলে মনিকাঞ্চন যোগ। সরকারি খাতায় হাইওয়ের প্ল্যান পাকা হয়ে গেছে, সেটা যাবে পার্কের পাশ ঘেঁষে, বটগাছটা যেখানে আছে, সেখানে হবে শহরের একটা প্রধান স্টপেজ আর তার এই চোদ্দ কাঠার বিশাল জায়গাটা আর আশপাশের আরো চার পাঁচটা বাড়ি নিয়ে সে বানাবে শপিং মল কাম রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্স। সে কমপ্লেক্সের খসড়া প্ল্যান অবধি কলকাতার কোন বড় আর্কিটেক্ট সংস্থাকে দিয়ে বানানো হয়ে গেছে। আশপাশের বাড়িগুলোর সাথে কথা হয়ে গেছে, সে নিয়ে কোনো চিন্তা নেই, এখন খালি তিনি অনুমতি দিলেই সে নাকি আগে বাড়তে পারে। ভাবলেন আলোকরঞ্জন, কি আস্পর্ধা লোকটার ! আর ভাবলেন, পয়সার লোভে লোকটাকে কতখানি অন্ধ করে তুলেছে ! পোদ্দার ভেবেই নিয়েছে যে পয়সায় সব হয়, ধরে বসে আছে যে আলোকরঞ্জন না করতেই পারেন না। পঁচাত্তরের বিপত্নীক বৃদ্ধ রিটায়ার্ড শিক্ষক, কাছে বলতে কেউ নেই, ছেলেরা সব বাইরে, ভরসা বলতে দুটো কাজের লোক, সে আবার না করবে কি ? সাথে সাথে আলোকরঞ্জন ভাবলেন, যে পোদ্দার যদি এরকম ভেবেই থাকে, তাহলে এই ভাবনার মধ্যে এতটুকুও ভুল নেই, সত্যিই তো তার জন্য দুটো কথা বলার কে আছে ! পুরোটাই পরভরসা তার। চারিদিকে চেয়ে তার নিজেকে বড় একা মনে হলো। যেদিন থেকে এই ব্যাপারটা তার গোচরে এসেছে, একটা অস্বাস্থকর অস্বস্তি তাকে মনে মনে কুরে কুরে খাচ্ছে সেটা তিনি বুঝতে পারছেন। সবচেয়ে নিরাশা ব্যাঞ্জক ব্যাপারটা হলো যে তার নিজের ছেলেরা যে দিন থেকে এটা শুনেছে, তারা যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। তাদের জন্যে, এ যেন একটা খুব বড় সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে । তিনি বুঝেছেন যে ছেলেরা ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে উঠেছিল যে বাপের এতো বড় বাড়ি, লাগোয়া ছ কাঠার বাগান, এই বিশাল সম্পত্তির কি বন্দ্যোবস্ত হবে, বিশেষত তার অবর্তমানে কে এসবের দেখভাল করবে ! এ যেন তাদের কাছে সব সমস্যার একেবারে হাতে গরম সল্যুশন, মেঘ না চাইতেই জল। তিনি জানেন ছেলেরা তার মৃত্যুকামনা করেনা মোটেই, লোভীও নয়, কিন্তু তাদের সংসার, ক্যারিয়ার ফেলে তাদের পক্ষে এই সম্পত্তি রক্ষা করা কোনো ভাবেই সম্ভব নয়, সোজা কথায় প্রাকটিক্যাল নয় একেবারেই। তার মনে পড়ল, ব্যাপারটা শুনে ফোনের উল্টো দিকে আকাশরঞ্জন, মানে তার বড়ছেলে জিজ্ঞেস করেছিল, কতদিন নাগাদ ব্যাপারটা বাস্তবায়িত হবে বলে তিনি মনে করেন !
এই সময়ে অন্নপূর্ণার অভাবটা তিনি খুব বেশি বোধ করেন। সে ছেড়ে চলে গেছে বছর দশেক। ভরা সংসার সাজিয়ে দিয়ে গেছে। দুই কৃতি ছেলে, ছেলের বৌ, নাতি নাতনির মুখ দেখে সে গেছে। নিজেকে অকাতরে বিলিয়ে, সবাইকে সুখী করে, বিনা নোটিসে একদিন হঠাৎ সে চলে গেলো অমৃতলোকে। পেছনে রেখে গেছে আলোকরঞ্জনকে, আর রেখে গেছে বাড়ির কোনায় কোনায়, পরিবারের প্রতিটি সদস্যের হৃদয়ে তার অনিবার্য্য উপস্থিতি। আত্মীয় অনাত্মীয় নির্বিশেষে সবাই তার অনিবার স্নেহ মমতা পেয়েছে। দুঃখের হলেও অন্নপূর্ণার স্মৃতি নিয়ে খেলা করা আলোকরঞ্জনের এক খুব বড় মনের আরামের জায়গা। প্রকৃতি ভালবাসতেন দুজনেই। বাড়ির লাগোয়া পার্কটা তখন হয়নি, জায়গাটা জলা জঙ্গল ছিল ! মনে পড়লো, বিয়ের পরে পরে নতুন বৌকে নিয়ে একদিন দুপুরে ঘুরতে ঘুরতে এই বটগাছটার কাছে এসেছিলেন। সময়টা বোধহয় মার্চের শেষ বা এপ্রিলের প্রথম দিক, সবে বসন্তের হালকা হাওয়া দিতে আরম্ভ করেছে। আলোকরঞ্জন সাধারণত সংযত প্রকৃতির, কিন্তু সেদিন সেই চৈত্রের দুপুরে হাওয়ায় কি যেন ছিল। বাচ্চা মেয়ের মত একটা জল-ফড়িঙের পিছনে ছুটে অন্নপূর্ণা হাসতে হাসতে বটগাছটার নিচে বসে পড়েছিল। দুটো কোকিল জগৎ ভুলে কুহুকুহু করে মান অভিমানের পালাগান গাইছিলো। কাছাকাছি জনপ্রাণী ছিল না। আলোকরঞ্জন আর সেদিন নিজেকে স্থির রাখতে পারেন নি। অন্নপূর্ণাও ! বাড়িতে বাবা মা, পিসি আর পিসির ছেলেপিলে আর ঠাকুর চাকর ভরা সংসারে অন্নপূর্ণাকে পেতেন খালি রাতে, চার দেয়ালের মধ্যে। উন্মুক্ত প্রকৃতির মাঝে এভাবে প্রিয়তমাকে পাওয়ার সে কি অনন্যসাধারণ অনুভূতি, আজন্ম ভোলার নয়। আলোকরঞ্জনের মনে হয়েছিল গোটা আকাশ যেন তার বিশাল চোখ মেলে এই দুটি তরুণ তরুণীর মিলন প্রত্যক্ষ করেছিল, পরমা প্রকৃতি যেন একসাথে তাদের আদর সোহাগ ভাগ করে নিয়েছিল ! লজ্জায় রাঙা হয়েও খুশিতে, আনন্দে ডগমগ করছিলো নতুন বৌ অন্নপূর্ণা। আঙ্গুল তুলে হঠাৎ বলেছিল, "এ মা, সব যে দেখে নিল একজন, যদি কাউকে বলে দেয় ?"
আলোকরঞ্জন ভুরু কুঁচকে জিগেস করেছিলেন, "কে একজন ?"
অন্নপূর্ণা আলোকরঞ্জনের বুকে মুখ রেখে চোখ বুঁজে আদরে ডুবে গিয়ে বলেছিলো, "ওই যে ওপরে হাজার চোখ মেলে দেখছে, বুড়ো বটগাছ !"
আলোকরঞ্জন হেসে বলেছিলেন, "ওহ, পিতামহ ? তিনি কাউকে বলবেন না, দেখছো না, নাতি নাতবৌয়ের প্রেমলীলা দেখে কত খুশি ? ফিসফিস করে আশীর্বাদ করছেন !"
সেই প্রথম আলোকরঞ্জন এই বুড়ো বটবৃক্ষকে পিতামহ সম্বোধন করেছিলেন। পরে কখনো কোনো লোকেশন বা ডাইরেকশন দিতে গিয়ে, রেফারেন্স দিতে দিতে আস্তে আস্তে বটবৃক্ষর সেই “পিতামহ” নাম তার পরিবারের মধ্যে চালু হয়ে যায়, এবং তারপর কি করে যেন লোকমুখে এই তল্লাট জুড়ে। সম্ভবত বেশ কয়েক বছর পরে অধ্যাপক হিসেবে রাষ্ট্রপতি সম্মান পাওয়ার পর এই পার্কটার উদ্বোধনের সময়ে এক লোকাল ক্লাবের ফাংশনে তাকে প্রধান অতিথি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, আর সেখানে তিনি এই বটগাছের কথা বলতে গিয়ে এই পিতামহ নামটা সর্বসমক্ষে বলেছিলেন। আপামর জনসাধারণের খুবই পছন্দ হয়েছিল নামটা। একটা দুঃখের সাথে সুখের স্মৃতির নিশ্বাস বেরিয়ে এলো আলোকরঞ্জনের।
শেলীর একটা কবিতার কয়েকটি লাইন মনে পড়ল, বিড়বিড় করলেন নিজের মনে, "উই লুক বিফোর এন্ড আফটার, এন্ড পাইন ফর হোয়াট ইজ নট, আওয়ার সুইটেস্ট সাংস আর দোজ, দ্যাট টেল আস স্যাডেস্ট থটস !" সত্যি কি, সমস্ত সুখস্মৃতির মধ্যেই একটা না পাওয়ার, অতৃপ্তির যাতনা লুকিয়ে থাকে ? কে জানে ! সেই প্রায় বালিকা অন্নপূর্ণাকে সেভাবে আর কোনোদিনই পাননি আলোকরঞ্জন, বৃহৎ সংসারের বৃহৎ দায়িত্ব, তার কর্মজালে জড়িয়ে খুব দ্রুত অন্নপূর্ণা গৃহিনী হয়ে উঠেছিল, আর আলোকরঞ্জনকে হতে হয়েছিল বৃহৎ সংসারের মূল কান্ড। পরে বহুবার ভেবেছেন আর একবার যদি অন্নপূর্ণাকে নিয়ে সেভাবে---, নাহ, তার সাহসে কুলোয় নি।
বাড়ি এসে পৌঁছতে পৌঁছতে খেয়াল হলো, সিগারেটটা ধরানো হয় নি। ভালোই হলো, চা খেয়ে তারপর তারপর ধরাবেন ‘খনে। অন্নপূর্ণা থাকতে সে বারণ করতো, যদিও খুব একটা কড়া ভাবে নয়, একটা হালকা অনুযোগ, একটু প্রশ্রয় মিশে থাকতো তাতে। মাঝে মাঝে আলোকরঞ্জন ভাবতেন, অন্নপূর্ণা তার সিগারেট খাওয়াটা ততখানি অপছন্দ করতো না বোধহয়। অনেক সময় সন্ধ্যেয় চা খেয়ে দীর্ঘ্যক্ষন সিগারেট না খেলে একটু ফিক করে অন্নপূর্ণাকে হেসে বলতে শুনেছেন তিনি, "কি হলো, আজ সিগারেট ধরালে যে না বড় ? এতো ভালো ছেলে কবে থেকে হলে ?" মোবাইলটা আর প্যাকেটটা বার করে টেবিলে রেখে হাঁক পারলেন, "গদাই, চা টা এবার দে।"
ছেলেদের প্রস্তাব ভাবতে বসলেন আলোকরঞ্জন। দুজনেই তাকে নিয়ে যেতে চায়। এখনও জোরাজোরি কিছু করেনি সেভাবে, কিন্তু দুজনেই তাকে ঠারেঠোরে শুনিয়েছে যে এভাবে একা একা এখানে পড়ে থাকার কোনো মানে হয় না। এবারে তিনি যেভাবে চান, দুই ছেলের মধ্যে যার সাথে থাকতে চান, তার কাছে গিয়ে থাকাটাই শ্রেয়। কথাটা খুব একটা অযৌক্তিক নয়। বাস্তবিক দিক থেকে দেখলে এর চেয়ে ভালো আর কিছু আর হতে পারেনা। কোন ভরসায় তিনি এখানে থাকবেন ? বুড়ো গদাই আর মালতি, মানে দুটো কাজের লোকের ভরসায়? এদের সততা আর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই, কিন্তু বিপদে আপদে এদের কতখানি সাপোর্ট দেওয়ার ক্ষমতা আছে ? বাড়িটার কি হবে সে কথা জিজ্ঞেস করতে ছেলেরা দুজনেই একটা ভাষা ভাষা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছে, "সে চিন্তা ভাবনা করে দেখা যাবে পরে" গোছের।
তিনি কিছুক্ষন বসে রইলেন স্থানু হয়ে, তারপর রিমোটটা নিয়ে টিভিটা চালিয়ে দিলেন, আপাতত ব্যাপারটা ভুলে থাকার জন্যেই হোক বা সেরকম কিছু করার নেই বলে। একটা বাংলা চ্যানেলে সিনেমা দেখাচ্ছে। নায়ক নায়িকা নেচে নেচে রাস্তায় প্রেম করে বেড়াচ্ছে, সাথে গুচ্ছের ছেলেপিলে নাচছে। কী যে ভাবে এই পরিচালকগুলো ! কি সব গুলে খাওয়াচ্ছে পাবলিককে। মনে পড়লো, একবার ইউরোপের একটা দেশে আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলেন তিনি, সেখানে কফি ব্রেকে একজন রিসার্চ স্কলার, ডেলিগেটদের মধ্যে এক স্বল্প পরিচিতা বিদেশিনী তরুণী তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ভারতবর্ষে ছেলে মেয়েরা এভাবে প্রেম করে বেড়ায় কিনা, মানে ভালোবাসা হলে রাস্তায় বিস্তর সঙ্গীসাথী নিয়ে নেচে নেচে প্রেম করে কিনা। উত্তর দিতে গিয়ে হেসে ফেলেছিলেন আলোকরঞ্জন। জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমেরিকান ফিল্মগুলোয় যে দেখায় হিরো আর ভিলেনরা কথায় কথায় দেদার গুলি চালিয়ে মুড়িমুড়কির মতো মানুষ মারে বা ইয়ং ছেলে মেয়েরা একদিনের দেখাতেই ডিনারে গিয়ে বিছানা শেয়ার করে সেগুলোকেও সে সত্যি ভাবে কিনা। তরুণী অত্যন্ত ভদ্রভাবে নিজের ভুল স্বীকার করেছিল সত্যি, কিন্তু আলোকরঞ্জন অস্বীকার করতে পারেননি যে এই সমস্ত সিনেমাগুলো কি সব অবাস্তব জিনিস দেখিয়ে বহির্বিশ্বে ভারতবর্ষের সম্মন্ধে অত্যন্ত ভুল ছবি তুলে ধরছে। হয় কবেকার কি সব প্রাচীন কুপ্রথাকে নতুন করে আবিষ্কার করে, তাই নিয়ে সিনেমা বানিয়ে বাইরে তুলে ধরে, আর তা নয় ভারতবর্ষের দারিদ্রকে মূলধন করে সিনেমা বানিয়ে, এখনকার অধিকাংশ পরিচালক স্বস্তায়, অল্প পরিশ্রমে নাম কিনছে। কুপ্রথা, দারিদ্র কোথায়, কোন দেশে নেই ? বাইরের চাকচিক্যটুকু তুলে দিলে মানুষ এখনো সেই স্বার্থান্ধ পশুবৃত্তির খুব একটা ওপরে উঠতে পারেনি। ইদানিং সব কিছুর বাণিজ্যায়ন হয়ে সমস্ত মানবজাতি খুব দ্রুত কি এক অনির্দেশ্য ভবিষ্যতের দিকে অন্ধবেগে ছুটে চলেছে ভাবলেও ভয় করে। আলোকরঞ্জন চিন্তা করলেন। সব কিছুর মধ্যে লাভের অঙ্ক দেখতে গিয়ে মানব জাতির ব্যালান্সসিটে লোকসানের দিকটা কি অসম্ভব ভারী হয়ে উঠেছে ! হেলথ-ড্রিঙ্ক কোম্পানি ঠিক করে দেবে কার ছেলেমেয়ে স্কুলে ফার্স্ট হবে, দাঁতের মাজনের কোম্পানি ঠিক করে দেবে ছেলেটার প্রেম নিবেদন সফল হবে কিনা, বাইকের কোম্পানি আর শ্যাম্পুর বোতল ঠিক করে দেবে কোন ছেলেটি কোন মেয়েটিকে পেছনে চাপিয়ে বাকি সবার ইর্ষাকাতর দৃষ্টির সামনে দিয়ে ধাঁ হয়ে যাবে ! কন্ডোম কোম্পানি ঠিক করে দেবে নরনারীর মিলন সফল হবে কিনা ! হায়রে বাণিজ্যায়ন ! পিতামহ শরশয্যায় যাবেন, না যান্ত্রিক করাতে ধরাশায়ী হবেন আর সেটা কবে, ঠিক করে দেবে ওই পোদ্দারের মতো "ইম্পোটেন্ট" গুটখাখোর জোকার !
(ক্রমশঃ )



সুচেতনা 4 সপ্তাহ 5 দিন আগে
খুবই উপভোগ্য
j ghosh 4 সপ্তাহ 5 দিন আগে
দারুণ
ক্রমশঃ চিহ্নটা আরো প্রলুব্ধ করছে
GB 4 সপ্তাহ 5 দিন আগে
সঙ্গে থাকতে বলছি, কারণ আজকাল ভাল গল্পের পাঠক দুর্লভ। মুক্তমঞ্চ সে অর্থে আমার জন্য অসম্ভব গুণগত মানের এক সুপার ক্লাষ্টার ।
শেষ পর্যন্ত বোধহয় নিরাশ হবেন না। এ আমার খুব প্রিয় টানটান উত্তেজনার একটা গল্প।
ঝর্না 4 সপ্তাহ 4 দিন আগে
খুব সুন্দর লিখেছেন। বটবৃক্ষ কখন যেন পরিচিত একজন হয়ে উঠলো।
পরবর্তী অংশের অপেক্ষা এখন।
Goppobaj 4 সপ্তাহ 4 দিন আগে
আন্তরিক ধন্যবাদ।
আমি জানিনা, গল্পের ধারা আর আবেশ অক্ষুণ্ন রাখতে পর্বগুলো সাপ্তাহিক হলে ভাল হয়, না কি আরও তাড়াতাড়ি !
নতুন মন্তব্য পাঠান