অনামিকা ই লা পোয়েসিয়া এস্পানিওলা

একজন কবিতা-কুটুম্ব's picture
লিনো

লাস্ট কল এই হল ...
পাশে এসে যে বসল ও কি অনামিকার মেয়ে ?
উড়োজাহাজ ছাড়বার আগের মুহূর্তে
তেরো বছর আগে
কার গলায় "যারে উড়ে যারে পাখি" শুনে
আমি কেঁদেছিলাম !
আকাশও আসলে খুব ছোট
বুকের ভিতর কেউ ডানা ঝাপটে আবার বলে উঠল

হুবহু সেই নয়ন
হেমন্তের আকাশ কি ফিরিয়ে দেয় সব কিছু ?
"তোমার মা কেমন আছে?"
ছোট্ট একটা প্রশ্ন হামিং বার্ড হয়ে
বন্ধ কাঁচের বাইরে আপ্রাণ মুক্তি খুঁজতে থাকে ...

 

কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়া সম্পর্কে অনামিকার ধারণা ছিল, পৃথিবীতে এমন আর একটি জায়গা নেই যেখানে মানুষের জীবনের এত বিচিত্র ইতিহাস, এত আশা-নিরাশা, এত প্রেম ও বিরহ একই সঙ্গে ধুলো জমা মলাটের ভিতরে গুমরে থাকতে পারে। সে যখন প্রথম সেখানে যাতায়াত শুরু করে, তখন তার বয়স ঊনিশ। প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্রী সে, কিছুটা ছটফটে, কিছুটা স্থিতধি। ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করলেও তার কৌতূহলের সীমা ছিল না। ক্লাসের বইয়ের বাইরেও যে একটা বিরাট জগৎ আছে, সে কথা অনামিকা অনেক আগেই জেনে গিয়েছিল।

সেদিন ছিল পৌষের শেষ বিকেল। শীত এমন কিছু তীব্র নয়, কিন্তু বাতাসে একটা স্বচ্ছতা ছিল - আকাশের রংও যেন অন্যদিনের তুলনায় কিছুটা গাঢ় নীল। কোনো কোনো মৃত শীতের বিকাল যেমন সহসা বসন্তময় হয়ে ওঠে। কলেজ স্ট্রিটের দোকানগুলোর সামনে পুরোনো বইয়ের স্তূপ, ভাঙা কাঠের তাক, আর সেগুলোর মধ্যিখানে কুঁজো হয়ে বসে থাকা বইবিক্রেতাদের দেখে মনে হচ্ছিল, এরা যেন বই বিক্রি করেন না, বরং মুহ্যমান অতীতের সব পাহারাদার।

একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে অনামিকার দৃষ্টি হঠাৎ আটকে গেল। বইটির মলাটে সোনালি অক্ষরে লেখা - ‘স্বর্ণযুগঃ স্পেনীয় নবজাগরণের কবিতাসমগ্র।’

দোকানদার বলল, “পুরোনো আমদানি করা বই। কেউ নেয়নি এখনও।” অনামিকা বইটা খুলে দেখল। ভেতরে গার্সিলাসো দে লা ভেগা, লোপে দে ভেগা, কেভেদো - নামগুলো যেন দূর দেশের হাতছানি দেওয়া ঘণ্টাধ্বনি।

বইখানা হাতে তুলে নিয়ে তার প্রথমেই মনে হয়েছিল, বস্তু হিসেবে বইটির মধ্যেই যেন একপ্রকার সৌন্দর্য আছে। পাতার ধারে সেই অসমান, ঢেউখেলানো কাটা কাটা কাগজের স্পর্শে এক ধরনের পুরোনো দিনের আভিজাত্য। বইটি যে বহু হাত ঘুরে এসেছে, অথচ এখনও নিজের মর্যাদা হারায়নি, তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।

পাতা উল্টাতে উল্টাতে সে যখন গার্সিলাসো দে লা ভেগার একটি কবিতার ইংরেজি অনুবাদের দিকে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে, তখনই পাশে দাঁড়ানো একজন যুবকের কণ্ঠস্বর শুনতে পেল।

- গার্সিলাসো দিয়ে শুরু করলে কিন্তু বিপদ আছে।

অনামিকা চমকে মুখ তুলল। এক জোড়া কৌতুকময় চোখ।

ছেলেটির বয়স বড়জোর বাইশ। গায়ের রং শ্যামলা, চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা, কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ। তার চেহারায় এমন কিছু ছিল না যা আলাদা করে দৃষ্টি আকর্ষণ করে, অথচ একবার তাকালে দ্বিতীয়বার না তাকিয়ে থাকা যায় না।

অনামিকা হেসে বলল, - বিপদ কেন?

যুবকটিও হাসল।

- কারণ মানুষ প্রথমে কবিতার প্রেমে পড়ে, তারপর কবির, তারপর একসময় না জেনেই অন্য কারও।

কথাটা বলে সে বইয়ের একটি পাতায় আঙুল রাখল।

- এই কবিতাটা পড়ে দেখুন। যদি ভালো না লাগে, বইটা কিনবেন না।

অনামিকা কি তখনও জানত যে কয়েকটি সাধারণ বাক্য কখনও কখনও মানুষের জীবনের গতিপথ সামান্য হলেও বদলে দিতে পারে!

বইটি সে কিনেছিল। কিন্তু বাড়ি ফিরে বই খুললে বারবার তার মনে পড়ছিল না গার্সিলাসোর কবিতা, না কেভেদোর সনেট - মনে পড়ছিল সেই অচেনা যুবকের মুখ।

কলকাতার মতো শহরে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে দেখা হয়, আবার তারা হারিয়েও যায়। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ আছে, যাদের উপস্থিতি প্রথম মুহূর্তেই যেন আমাদের চেনা বাস্তবতার ভিতরে অদৃশ্য একটি রেখা টেনে দেয়। অনামিকা পরে বহুবার ভেবেছে, অনিমেষকে প্রথম দেখার সময়ই হয়তো সেই রেখাটি টানা হয়ে গিয়েছিল।

তিন সপ্তাহ পরে কফি হাউসে আবার দেখা।

বাইরে তখন বিকেলের আলো ধীরে ধীরে মলিন হয়ে আসছে। কলেজ স্ট্রিটের কোলাহল জানলার ফাঁক দিয়ে ভিতরে ঢুকে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে কাপের ধোঁয়ার মধ্যে। অনামিকা একা বসে ছিল। সামনে খোলা - দা গোল্ডেন এজ।

হঠাৎ সে শুনল -

- তা হলে শেষ পর্যন্ত বইটা কিনেছিলেন।

মুখ তুলে দেখে, সেই যুবক।

সেদিনই প্রথম তার নাম জানা গেল - অনিমেষ।

তারপর কথোপকথন শুরু হল। প্রথমে বই নিয়ে, তারপর কবিতা নিয়ে, তারপর এমন সব বিষয় নিয়ে যার সঙ্গে বইয়ের সম্পর্ক নেই অথচ অদ্ভুতভাবে আছে। তারা আলোচনা করল গার্সিলাসোর রাখালদের, কেভেদোর মৃত্যুচেতনা, সান হুয়ান দে লা ক্রুসের আধ্যাত্মিক প্রেম। কখন যে আলোচনা গিয়ে পৌঁছল কলকাতার পুরোনো বাড়ি, ট্রামের শব্দ, লাল ডাবল ডেকার, ওয়েলিংটনের পুরোনো ভিনাইল রেকর্ডের দোকানগুলি কিংবা শৈশবের স্মৃতিতে, কেউই বুঝতে পারেনি।

সেই দিন সন্ধ্যার সময় কফি হাউস থেকে বেরিয়ে তারা কলেজ স্কোয়ার পর্যন্ত হেঁটে গিয়েছিল। স্কোয়ারে সুইমিংপুলগুলিতে অন্ধকার নেমে এসেছে, দূরে আলো জ্বলছে। কথাবার্তা তখনও থামেনি।

মানুষের জীবনে এমন কিছু সম্পর্ক আছে, যেগুলো শুরু হয় কোনো ঘোষণা ছাড়াই। প্রথম দিকে সেগুলিকে বন্ধুত্ব বলেই মনে হয়। অথচ ভিতরে ভিতরে অদৃশ্য শিকড় ইতিমধ্যে মাটির অনেক গভীরে পৌঁছে যায় ....
[ ক্রমশঃ ]

jojo's picture
‘ছোট্ট একটা প্রশ্ন হামিং

jojo 2 সপ্তাহ 3 দিন আগে

‘ছোট্ট একটা প্রশ্ন হামিং বার্ড হয়ে’

সো টাচি লাইন
গল্পের শুরুটাও

মাকি's picture
শুরুটা বেশ, কাহিনী আগে বাড়ুক

মাকি 2 সপ্তাহ 2 দিন আগে

শুরুটা বেশ, কাহিনী আগে বাড়ুক

ঝর্না's picture
ভীষন ভীষন ভালো লাগলো পড়তে।

ঝর্না 2 সপ্তাহ 10 ঘন্টা আগে

ভীষন ভীষন ভালো লাগলো পড়তে।

"কারণ মানুষ প্রথমে কবিতার প্রেমে পড়ে, তারপর কবির, তারপর একসময় না জেনেই অন্য কারও"

খুব সত্যি

"মানুষের জীবনে এমন কিছু সম্পর্ক আছে, যেগুলো শুরু হয় কোনো ঘোষণা ছাড়াই। প্রথম দিকে সেগুলিকে বন্ধুত্ব বলেই মনে হয়। অথচ ভিতরে ভিতরে অদৃশ্য শিকড় ইতিমধ্যে মাটির অনেক গভীরে পৌঁছে যায় ...'"

একদম।
অপেক্ষা রইল।

ASIT KUMAR ROY's picture
এই গল্পে এই কবিতায় হারানো

ASIT KUMAR ROY 1 সপ্তাহ 6 দিন আগে

এই গল্পে এই কবিতায় হারানো সুরে
আঁকা বাঁকা অলি গলিতে হারানোর নেশা।
যদি আমি কখনো হারিয়ে যায়
কেউ যেন আমায় খুঁজনা।
সর্ষেক্ষেত বা কাজল কালো চোখ হয়তো নেই;
এই কাঠ কাঠ শহরের প্রথম বৃষ্টিতে
ভিজে যাবার আমন্ত্রন এলে
নিজেকে ধরে রাখতে পারব না।
আউটট্রাম ঘাটের সিঁড়িতে বসে দেখব
অফুরান ঢেউ-এর আনাগোনা।
আর ওপারে ধূসর নদীর রূপরেখা।

কেউ এসে বলবে ঘরে ফেরার সময় হয়েছে
দেখছ না পাখীরা বাসায় ফিরছে একে একে।
শেষ স্টিমার সমাপনের বাঁশি বাজিয়েছে।
ভিজে সবুজ ঘাস মাড়িয়ে এগিয়ে যাও...
আঁধারে প্রদীপ দেওয়া ঘরে
সেখানে কেউ না কেউ আছে অপেক্ষায়।
এই শহরেও এখনো প্রেম আছে।
ঝরা পাতার বুকে কান্না আছে
শহীদ মিনারের বুকে জমে আছে
আরব্য রজনীর অনেক গল্প কথা।



নতুন মন্তব্য পাঠান

  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <b> <font color> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <small>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • You may use [inline:xx] tags to display uploaded files or images inline.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.
  • You may use <swf file="song.mp3"> to display Flash files inline