স্প্যানিশ রেনেসাঁর কবিতা

একজন কবিতা-কুটুম্ব's picture
সেরালিয়ন

‘‘সবই থেকে যাবে। শুধু আমি ছাড়া।’’ - ট্রেলার, শ্রীহরি গলগ্রহ

 
সম্প্রতি এডিথ গ্রসম্যানের স্বর্ণযুগ: স্প্যানিশ রেনেসাঁর কবিতা পড়ে ভীষণ আনন্দ পেয়েছি। বইটি স্পেনের সাহিত্যিক স্বর্ণযুগের (পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ) আটজন শ্রেষ্ঠ কবির নির্বাচিত কবিতার সংকলন। এঁদের মধ্যে রয়েছেন হোর্হে মানরিকে, গার্সিলাসো দে লা ভেগা, সান হুয়ান দে লা ক্রুস, ফ্রাই লুইস দে লেওন, লোপে দে ভেগা, লুইস দে গঙ্গোরা, ফ্রান্সিসকো দে কেভেদো এবং যেহেতু তাঁর বইগুলো প্রথম স্পেনেই প্রকাশিত হয়েছিল - মেক্সিকান কবি সোর হুয়ানা ইনেস দে লা ক্রুস।

নির্বাচিত কবিতার সংখ্যা সীমিত হওয়ায় (যেমন, প্রায় ৩,০০০ সনেট ও ২,০০০ নাটকের রচয়িতা লোপে দে ভেগার ক্ষেত্রে মাত্র তিনটি ছোট কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে) এই সংকলন কবিদের সৃষ্টিকর্মের কেবল এক ঝলকই দিতে পারে। তবুও গ্রসম্যান এই যুগ সম্পর্কে অসাধারণ একটি ভূমিকা উপস্থাপন করেছেন। প্রতিটি কবির সংক্ষিপ্ত জীবনী, খোদাই করা প্রতিকৃতি এবং বিপরীত পাতায় মূল স্প্যানিশ পাঠ সংযোজিত হয়েছে। হার্ডকভার সংস্করণটি নিজেও অত্যন্ত সুন্দর - ডেকল-ধারযুক্ত র‍্যাগ পেপারে মুদ্রিত। এক সন্ধ্যায় আমার স্ত্রী নিজের বই পড়তে পড়তে বারবার আমার বইটির দিকে তাকাচ্ছিলেন এবং শেষে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কী এমন সুন্দর বই পড়ছ?”

জীবনীগুলোতে কবিতার রূপ ও শৈলী, ঐতিহাসিক উদ্ভাবন এবং স্মরণীয় জীবনীমূলক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, গঙ্গোরার অলংকারময় culteranista শৈলীর কারণে তাঁকে “অন্ধকারের যুবরাজ” বলা হতো - এই শৈলীকে লোপে দে ভেগা ও কেভেদো বিদ্রূপ করতেন। আবার ফ্রাই লুইস দে লেওনের ইহুদি converso (ধর্মান্তরিত) পটভূমি এবং বাইবেলের কাহিনীর হিব্রু উৎসকে সম্মান জানানোর দৃঢ়তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। চার বছর কারাবাসের পর শিক্ষকতায় ফিরে এসে তিনি নাকি প্রথম ক্লাস শুরু করেছিলেন এই বলেঃ “যেমন আমি সেদিন বলছিলাম...”

সোর হুয়ানা জীবনের শেষদিকে তাঁর ৪,০০০ খণ্ডের বিশাল গ্রন্থাগার - যা সে সময়ে মেক্সিকোর বৃহত্তম ছিল - দরিদ্রদের জন্য দান করে দেন এবং পরে দরিদ্রদের সেবা করতে গিয়েই মৃত্যুবরণ করেন।

বইটির অনেক কবিতার কেন্দ্রীয় বিষয় হলো জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব ও অনিত্যতা। এ ধরনের গভীর বিষণ্ণতার প্রকাশে কেভেদো নিঃসন্দেহে সর্বশ্রেষ্ঠ। এক কবিতায় তিনি লিখেছেন, “আমি এক ক্লান্ত ‘ছিলাম’, ‘হব’ এবং ‘আছি’।” আরেকটি কবিতা, “Sonnet XVIII”-এ তিনি জীবনকে মৃত্যুর দ্বারা পরিবেষ্টিত বলে এক তীব্র অনুভূতি প্রকাশ করেনঃ

এই ক্ষণস্থায়ী মরণশীল জীবনের বছর
সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়, উপহাস করে
ইস্পাতের সাহস আর শীতল দীপ্ত মার্বেলকে,
যারা সময়কে চ্যালেঞ্জ করতে চায়।
আমার পা হাঁটতে শেখার আগেই
সে মৃত্যুর পথে এগোয়, যেখানে আমি পাঠাই
আমার অস্পষ্ট জীবনকে - এক দরিদ্র, উত্তাল নদী,
যা গ্রাস হয়ে যায় অন্ধকার সাগরের ঢেউয়ে।
প্রতিটি ক্ষণ এক দীর্ঘ পদক্ষেপ,
আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমি এগিয়ে যাই
স্থির থাকলেও, ঘুমালেও, আমি ছুটে চলি।
এক ক্ষণিক আর্তনাদ, এক তিক্ত দীর্ঘশ্বাস
সেটাই মৃত্যু, আমাদের উত্তরাধিকার।
যদি তা নিয়তি হয়, শাস্তি নয়, তবে আমি শোক করি কেন?

দূর থেকে পূজিত নারীদের উদ্দেশে লেখা প্রেমের কবিতাও এখানে প্রচুর। সেখানে দেখা যায় “তুষারের মতো শুভ্র বক্ষ”, “আমন্ত্রণময় রক্তিম ঠোঁট”, “তোমার গালে ঊষা, তোমার চোখে ফিবাস (সূর্যদেব)” ইত্যাদি চিত্রকল্প। লোপে দে ভেগা তাঁর “Folk Song VII”-এ এই ধরনের ক্লিশে অতিক্রম করতে চেষ্টা করেনঃ

তোমার সুন্দর চোখ, লুসিন্দা,
আকাশের তারকা নয় বটে,
কিন্তু তাদের দীপ্তি, তাদের মধুর আলো
তাতে যদি কিছু ঐশ্বরিক না থাকে,
তা হতে পারে না।

কবি বিলি কলিন্স তাঁর ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন যে, এই উচ্চমার্গীয় প্রেমের ভাবকে কিছুটা বিদ্রূপাত্মকভাবে ভারসাম্য দিয়েছে সান হুয়ান দে লা ক্রুসের ধর্মীয় কবিতাগুলি, যেগুলো প্রকৃতপক্ষে অত্যন্ত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য। সেন্ট তেরেসা অব আভিলার শিষ্য হিসেবে তিনি এমন ভাষায় আধ্যাত্মিক মিলনের কথা বলেছেন, যা কোনো বাস্তব নারীকে উদ্দেশ করে লেখা হলে কেলেঙ্কারির সৃষ্টি করতে পারতঃ

হে জীবন্ত প্রেমের শিখা,
যে এমন কোমলতায় বিদ্ধ করে
আমার আত্মার গভীরতম কেন্দ্রকে,
এখন যখন তুমি আমার কাছে এসেছ,
যদি ইচ্ছে হয়, তবে সমাপ্ত করো
আর ছিন্ন করো এই মধুর মিলনের আবরণ।

(“Song III: Flame of Living Love” থেকে)

বইটির সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর কবিতাগুলোর একটি হলো লোপে দে ভেগার “Instant Sonnet”, যা তার আত্ম-সচেতনতার জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পুরো ১৪ লাইনের সনেটটি তিনি সনেট লেখার প্রক্রিয়া নিয়েই লিখেছেনঃ

ভিওলান্তে আমাকে একটি সনেট লিখতে বলেছে,
জীবনে এমন চাপে পড়িনি কখনও।
বলে, সনেটে থাকে চৌদ্দটি পঙক্তি
এখনও ঠিকমতো শুরুই করিনি, অথচ চারটি হয়ে গেছে ...

তবে বইটির মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় রচনা সম্ভবত গার্সিলাসো দে লা ভেগার দীর্ঘ কবিতা “Eclogue I” ভার্জিলের গ্রামীণ eclogue-এর আদলে রচিত এই কবিতায় দুই রাখাল - সালিসিও ও নেমোরোসো - তাদের প্রিয় নারীদের হারানোর শোক প্রকাশ করে। সালিসিওর প্রেমিকা অন্য পুরুষের সঙ্গে চলে গেছে, আর নেমোরোসোর প্রেমিকা মারা গেছে।

কবিতাটি যেন এক নিখুঁত ক্ষুদ্রচিত্র। শুরুতে গার্সিলাসো যেন ক্যামেরা নিয়ে গ্রামীণ দৃশ্যের দিকে এগিয়ে যানঃ

“তাদের ভেড়াগুলোও তাদের মধুর গান শুনে
ঘাস খাওয়া ভুলে গিয়েছিল,
প্রেমের বিলাপ শুনছিল।”

এরপর কয়েক পৃষ্ঠা জুড়ে দুই রাখালের গভীর শোক ও বেদনার কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। শেষে কবি আবার দৃশ্যপটের বাইরে সরে এসে শান্ত সন্ধ্যার চিত্র আঁকেনঃ

রাখালরা কখনও তাদের বিলাপ থামাত না,
যদি না তারা দেখত সোনালি সূর্যাস্তে
লাল মেঘের প্রাকারে দিনের অবসান।
ছায়ারা নেমে আসছিল দ্রুত,
সর্বোচ্চ পাহাড়ের ঢাল বেয়ে।
যেন স্বপ্ন থেকে জেগে উঠে
তারা তাদের ভেড়াগুলো একত্র করল,
আর ধীরে ধীরে, পদে পদে,
দুই রাখাল ফিরে গেল।

গার্সিলাসো একটি সাধারণ গ্রামীণ দৃশ্য - দুই রাখাল ও তাদের পশুপালের মধ্যে গভীর মানবিক অনুভূতির এক অসাধারণ অন্তর্জগৎ সৃষ্টি করেছেন। হয়তো তাঁর পৃষ্ঠপোষককে উদ্দেশ করে এই কাহিনী বলার মাধ্যমে তিনি কষ্ট ও সহানুভূতির প্রতি এক ধরনের অন্তর্মুখী উপলব্ধির দিকেও ইঙ্গিত করেছেন।

গ্রসম্যানের এই সংকলন একটি আদর্শ সংকলনের কাজই করেছে - পাঠকের আরও পড়ার আগ্রহ জাগিয়ে তুলেছে। অন্তত আমার ক্ষেত্রে, কেবল কয়েকজন কবি নয়, এই আটজনের প্রত্যেকের প্রতিই নতুন করে আগ্রহ জন্মেছে। আর গার্সিলাসো দে লা ভেগার আরও কিছু কবিতা পড়ে যা বুঝেছি, তাতে মনে হচ্ছে সামনে আরও অনেক সাহিত্যিক রত্ন অপেক্ষা করছে।

ঝর্না's picture
ভালো লাগলো পড়তে। তথ্য

ঝর্না 2 সপ্তাহ 9 ঘন্টা আগে

ভালো লাগলো পড়তে। তথ্য সম্পূর্ণ এ লেখনী।
কিছু অংশ মনে হলো অনুবাদ করা হয়েছে। যাইহোক ভালো লাগলো।



নতুন মন্তব্য পাঠান

  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <b> <font color> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <small>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • You may use [inline:xx] tags to display uploaded files or images inline.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.
  • You may use <swf file="song.mp3"> to display Flash files inline