শেষতম ম্যাজিশিয়ানের সঙ্গে

শেষতম ম্যাজিশিয়ানের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল এক বিকেলে, যখন পৃথিবীর অধিকাংশ জিনিসই নিজেদের অর্থ বদলে ফেলছিল। আমি নিশ্চিত নই সেটি বৃহস্পতিবার ছিল কি না, কারণ সেদিন সব ক্যালেন্ডারেরা দেয়াল ছেড়ে উড়ে গিয়েছিল এবং আকাশে পাখির মতো চক্কর কাটছিল। তবু মনে আছে, আমি একটি ছোট্ট চা-ঘরে ঢুকেছিলাম - যে চা-ঘরটি একইসঙ্গে একটি কথোপকথন, একটি ভুলে যাওয়া স্মৃতি এবং একটি পুরনো জাদুর কৌশল ছিল।
সেখানে তিনি বসে ছিলেন।
শেষতম ম্যাজিশিয়ান।
তার সামনে একটি সাদা কাপ। কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছিল না - উঠছিল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সিঁড়ি। সিঁড়িগুলো ধীরে ধীরে উপরে উঠছিল এবং মাঝপথে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল, যেন কোনো অদেখা প্রাণী সেগুলো খেয়ে ফেলছে।
তিনি আমাকে দেখে হাসলেন।
সেই হাসির ভেতর থেকে প্রথমে একটি পায়রা বেরিয়ে এল। প্রথাগত। তারপর একটি খরগোশ। তারপর আরেকটি পায়রা। তারপর একটি সম্পূর্ণ বাগান। ফুলগুলো বাতাসে ঝুলতে লাগল। তাদের কোনো ডাঁটা ছিল না, কোনো মাটি ছিল না। তবু তারা প্রস্ফুটিত হতে লাগল। ফুলের পাশে একটি তাসের প্যাকেট নিজে নিজে খুলে গেল। হরতনের বিবি, চিড়িতনের গোলাম, ইস্কাপনের টেক্কা - সবাই যেন দীর্ঘদিন পর কোনো পুরনো কৌতুক শুনে হেসে উঠল।
আমি চায়ের কাপে চুমুক দিলাম।
চায়ের স্বাদ ছিল ঠিক সেইরকম, যেমন হয় বহু বছর আগে দেখা কোনো স্বপ্নকে হঠাৎ মনে পড়ে গেলে।
“তুমি দেরি করে এসেছ,” শেষতম ম্যাজিশিয়ান বললেন।
“কোথায়?”
“আমার সমাপ্তিতে।”
আমি উত্তর দেওয়ার আগেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তারপর এমন কিছু করলেন যা দেখে বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতাও আমার হারিয়ে গেল।
তিনি নিজের বুকের মধ্যে নিজেই ঢুকে গেলেন।
কোনো রক্ত নেই, কোনো ক্ষত নেই। যেন তার বক্ষদেশ আসলে একটি দরজা ছিল এবং তিনি বহুদিন ধরে সেই দরজার অপর পাশে বাস করতেন। কয়েক মুহূর্ত পর সেখানে আর কেউ রইল না।
শুধু তার খালি চেয়ার।
আর তারপর।
তার বুকের ভেতরের অন্ধকার থেকে একে একে বেরিয়ে আসতে লাগল লাশ। একটি। দুটি। দশটি। পঞ্চাশটি।
শত শত।
প্রতিটি ছিল শেষতম ম্যাজিশিয়ানেরই মৃতদেহ, কিন্তু কোনো দুটির মুখ এক ছিল না। কেউ বৃদ্ধ, কেউ শিশু, কেউ নারী, কেউ পাথরের তৈরি, কেউ সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, কারও শরীর জুড়ে ঘাস গজিয়েছে, কারও চোখের জায়গায় ক্ষুদ্র গ্যালাক্সি ঘুরছে।
সবাই এসে আমার চারপাশে বসল।
ওয়েটার অতিরিক্ত কাপ এনে দিল।
মনে হল, সে যেন এই দৃশ্য বহুবার দেখেছে।
লাশগুলি চা খেতে শুরু করল।
তাদের মধ্যে একজনের গলা থেকে বালু ঝরছিল। সে বলল, “আমি সেই ম্যাজিশিয়ান, যে মরুভূমিকে সমুদ্র বানাতে চেয়ে ব্যর্থ হয়েছিলাম।”
আরেকজন বলল, “আমি সেই ম্যাজিশিয়ান, যে সমস্ত আয়নার প্রতিচ্ছবি মুক্ত করে দিয়েছিলাম। পরে পৃথিবীতে মানুষের চেয়ে প্রতিচ্ছবির সংখ্যা বেশি হয়ে গিয়েছিল।”
আরেকজন বলল, “আমি সেই ম্যাজিশিয়ান, যে একদিন ভুল করে মৃত্যুকে অদৃশ্য করে ফেলেছিলাম। তিন বছর কেউ মরতে পারেনি। পরে আমরা খুব অনুতপ্ত হয়েছিলাম।”
তারা সবাই কথা বলতে লাগল।
আমি ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম, এরা মৃতদেহ নয়।
এরা সম্ভাবনা। অথবা এরা সবাই সেই চূড়ান্ত কেশবতীর লুপ্ত হয়ে যাওয়া বয়ফ্রেন্ড, গার্লফ্রেন্ড, ফিলোজফিকাল গাইড বা লিভইন পার্টনার।
শেষতম ম্যাজিশিয়ানের যত জীবন হতে পারত, যত ব্যর্থতা, যত বিজয়, যত অসমাপ্ত রূপ -।
একজন তার পকেট থেকে একটি ভাঙা ঘড়ি বের করল।
ঘড়িটির কাঁটা সময় মাপছিল না।
বরং স্মৃতি মাপছিল।
যার যত বেশি স্মৃতি, তার কাছে সময় তত দ্রুত চলছিল।
আরেকজন তার মুখ খুলল।
মুখের ভেতরে একটি সমুদ্র দেখা গেল।
সেখানে মাছেরা জলের বদলে পুরনো ভবিষ্যতে সাঁতার কাটছিল।
আমি তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখলাম, একটি মাছের পিঠে বসে সেই কেশবতী কন্যের এক সংস্করণ কোথাও চলে যাচ্ছে - সম্ভবত এমন কোনো জীবনের দিকে, যা আমি কখনও বাঁচিনি।
“তোমাদের শেষতম অভিলাষ কী?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
সবাই থেমে গেল।
চা-ঘরের ভেতর হঠাৎ এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল।
এমন নীরবতা, যার শব্দ শোনা যায়।
তারপর তারা একসঙ্গে বলল -
“আমরা বাস্তব হতে চাই না।”
আমি ভেবেছিলাম অন্য কিছু শুনব।
অমরত্ব।
পুনর্জন্ম।
মুক্তি।
কিন্তু না।
“বাস্তবতা খুব সংকীর্ণ,” বলল এক লাশ।
“বাস্তবতা একটিমাত্র জীবন দেয়,” বলল আরেকজন।
“বাস্তবতা নির্বাচন করতে বাধ্য করে,” বলল তৃতীয়জন।
“আর আমরা,” তারা একসঙ্গে বলল, “আমরা সব নির্বাচিত না-হওয়া সম্ভাবনার রাজ্য।”
এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে চা-ঘরটি কেঁপে উঠল।
দেয়ালগুলি মোমের কবিতা হয়ে উঠতে লাগল। নরম। গলে যাওয়ার উপক্রমে। দেখলাম, চা-ঘরের বাইরে কোনো রাস্তা নেই। কোনো শহর নেই। কোনো পৃথিবী নেই।
বরং চারদিকে অসংখ্য চা-ঘর ভাসছে মহাশূন্যে।
প্রতিটি চা-ঘরে একজন শেষতম ম্যাজিশিয়ান বসে আছেন।
প্রতিটি টেবিলে একজন আমি।
প্রতিটি আমি ভিন্ন। তবু কেউ এখনো জন্মায়নি।
আর প্রত্যেকেই চা খাচ্ছে।
প্রত্যেকেই একই প্রশ্ন করছে।
প্রত্যেকেই একই উত্তরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তখন আমি অনুভব করলাম, আমার নিজের বুকের ভেতর কিছু নড়ছে।
শেষতম ম্যাজিশিয়ানের সব লাশ একসঙ্গে আমার দিকে তাকাল।
তাদের চোখে দুঃখ ছিল।
করুণা ছিল। এবং অদ্ভুত এক পরিচিতির মায়া।
“সময় হয়েছে,” তারা বলল।
“কিসের?”
তারা উত্তর দিল না।
বরং ইশারা করল আমার বুকে।
আমি নিচে তাকালাম।
দেখলাম, আমার বুকের মাঝখানে একটি ক্ষুদ্র দরজা তৈরি হয়েছে।
দরজাটি আগে কখনও ছিল না।
অথবা ছিল, আমি খেয়াল করিনি।
সেখানে কান পাততেই শুনতে পেলাম অসংখ্য মানুষের কণ্ঠস্বর।
তারা হাসছে। কথা বলছে। চা খাচ্ছে।
শেষতম ম্যাজিশিয়ানের সবকটি লাশ তখন আমাকে বিদায় জানাচ্ছে।
তাদের কাপ এখনও অর্ধেক ভরা।
চা এখনও গরম।
আর তাদের মুখে সেই অদ্ভুত হাসি - যে হাসি দেখে বোঝা যায়, কোনো গল্পই কখনও শেষ হয় না। গল্প কেবল নিজের ভিতরে ঢুকে যায়। তারপর অন্য কোনো দরজা দিয়ে আবার বেরিয়ে আসে।



হিয়া 26 2 সপ্তাহ 4 দিন আগে
ব্যাপক !গভীর ! ভীষণ ভাল লাগলো !
hiya raja 2 সপ্তাহ 3 দিন আগে
তাসি সে এক তাসমহলে
বসিয়া হাসে তাসি
শূন্য শুরু শূন্যতে শেষ
বানায় অশেষ রাশি
তাসির মধ্যে সে এক তাসি
তাসি বসি তায়
তাসিকে দেখিয়া তাসি
তাসিতে লুকায় !!
ঝর্না 2 সপ্তাহ 10 ঘন্টা আগে
একদম অন্যরকম ও ভীষন ভালো লেখা।
নতুন মন্তব্য পাঠান