সন্দীপনের রাধাচরিতমানস

একজন কবিতা-কুটুম্ব's picture
গপ্পোবাজ

(একটা লাস্ট-বেঞ্চ মার্কা পাতি গপ্পো দেওয়া গেল, কোনো ইন্টেলেকচুয়াল বারতা নেই - ভাল লাগলে পরের পর্ব হবে )

সন্দীপনের রাধাচরিতমানস

সন্দীপন চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলেন, পেনটা বন্ধ করে ভাবতে বসলেন, এর পর কি।
গত তিনটি সপ্তাহ ধরে একটি জনপ্রিয় বাংলা দৈনিকের রবিবাসরীয়তে তার রচনা ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়েছে। বিষয়বস্তু বহুচর্চিত, রাধাকৃষ্ণের পূর্বরাগঘটিত ব্যাপার স্যাপার, কিন্তু একটু ভিন্ন রূপে পরিবেশন করেছেন সন্দীপন। গত সংখ্যায়, দেখিয়েছেন গোপবধূ রাধা অবশেষে, সমস্ত সংসার বন্ধন ভুলে কানাইয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। অভিমানভরে রাধা তার কানুকে বলেছেন, কৃষ্ণ নাকি তার সমস্ত নারী ব্যক্তিত্বের অধিকার অস্বীকার করে তার হৃদয় ও মনের কৌমার্য হরণ করেছেন, তার আত্মাভিমান এমন নির্দয় হাতে নষ্ট করেছেন, যে তার নিজের বলতে আর কিছু অবশিষ্ট নেই।
সিরিজটা এখানে শেষ হতে পারত, কিন্তু বাধ সেধেছে তার পাঠিকাকুলের প্রবল সমালোচনা। তাদের সমস্যা হল কৃষ্ণের কাছে রাধার এই নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ নাকি একপেশে ও পুরুষপন্থী ব্যাপার স্যাপার !
পাঠিকাকুলের কারো কারো মতে তিনি নাকি প্রবল পুরুষপন্থী, প্রথাগত ধ্যান ধারনা থেকে বেরোতে পারেন নি, তিনি নাকি বহিরঙেই আধুনিক, ভেতরে ভেতরে সেই প্রাচীনপন্থী। তবে এ কথাটা সন্দীপন ভালই জানেন। তিনি ভাবেন যে এ হতেই পারে, তার নিজের আজন্মলালিত সংস্কার অজান্তে কলম বেয়ে বেরিয়ে আসতেই পারে। সন্দীপন একটু চিন্তায় আছেন।
গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো আর এক উৎপাত আরম্ভ হয়েছে গত দু সপ্তাহ ধরে। কোনো এক পত্রিকায় তার নাম ধাম পড়াশোনা ইত্যাদি সম্পর্কে কিছু ইনফরমেশন ছেপে ছিল। তারপর কি করে যেন বাড়ির ল্যান্ডফোনটার নাগাল পেয়েছে অতি উৎসাহী কেউ।
একটি মহিলা কণ্ঠ সময়ে অসময়ে হানা দেয় তার ল্যান্ড ফোনটিতে। প্রথমে ভেবেছিলেন সম্ভবত অকালপক্ক ইউনিভার্সিটির বালিকা, পরে সে ভুল ভেঙেছে। ফোনবাহিনী আভাস দিয়েছেন যে তিনি আর যাই হোন, সাধারণ অর্ধশিক্ষিত বালিকা নন, গভীর মননশীলতার অধিকারিণী, রসিকা, এবং বাক্যবাণে অতীব পারদর্শিনী। কথায় কথায় ঝরে পড়ে হিউমার, স্যাটায়ার আর আয়রণির ফুলঝুরি।
শেষ পর্যায়ের লেখা বার হবার পরেই একদিন সন্ধ্যেবেলা তার ফোন এলো,
"তারপর সন্দীপনবাবু, অতঃ কিম ? শ্রীমতিকে তো কদমতলায় বসিয়ে দিয়েছেন, এবার আপনাদের কেষ্টাবাবুকে পরমপুরুষের খোলসটা পড়াবেন, তাই তো ?"
উফফ, পাকামির হাতবাকসো ! কি সাহস ! সন্দীপন হেসে ফেললেন। কিন্তু সত্যি ভেবে পেলেন না, এর পর কি থাকতে পারে। তার লেখা কাহিনীতে পরমপুরুষ কৃষ্ণ, শ্রীরাধাকে নিজের মতো করেই পেয়েছেন, ভেঙ্গে গেছে শ্রীরাধিকার সাধারণ সাংসারিক মোহ আর তার আত্মিক কারাগার, প্রেম যমুনায় যুগলে অবগাহন করে তৃপ্ত পরমা প্রকৃতি এবং পরম পুরুষ। অতঃপর আর কি থাকতে পারে লেখার !
সফল লেখক সন্দীপন এরপর লেখার আর কি থাকতে পারে কিছু ভেবে পেলেন না !
দক্ষিণের জানলাটা দিয়ে ব্যস্ত বাতাস খানিকটা হু হু করে ঢুকে পড়ল।
সামনে দোল, বাতাসে কোনো নাম না জানা ফুলের মৃদু সুগন্ধ। সন্দীপন এর নাক খুব তীক্ষ্ণ। শহরতলীর এই জায়গাটায় বাড়ি হওয়ায়, প্রকৃতির সাথে তার নিজের খুব সুন্দর একটা যোগসূত্র তৈরি হয়েছে গত কয়েক বছরে। সমস্ত দিন বিভিন্ন পাখির কলকাকলি আর তার সাথে গাছ-গাছালির ভাষা শুনতে শুনতে মনে হয়, এই সংগীত তার খুব ভালো করে চেনা, খালি স্মৃতি খোয়ানো ব্যক্তির মত ধরি ধরি করে ধরতে পারছেন না।
দিন তিন চার হলো, পাশের বাড়ির রাজেন ঘোষ বৃদ্ধ মা আর ফ্যামিলি নিয়ে পুরী বেড়াতে গেছেন। আর যাবার আগে বাড়ির পোষা কোকিলটা খাঁচাসুদ্ধ সন্দীপনকে দিয়ে গেছেন । মাসখানেক আগে নাকি ঝড়ের সন্ধ্যেয় কোকিলটা পাখা ভেঙে পড়ে ছিল তার বাড়ির আলসেতে। তার পর থেকে তিনি সেটাকে রেখেছেন নিজের কাছে। অদ্ভুত ভাবে কোকিলটা আজ অবধি একবারও ডাকেনি। কেন কে জানে।
সন্দীপন আব্দুলকে বললেন বাজারে যাবার সময় খাঁচাটা বারান্দায় ঝুলিয়ে দিয়ে যেতে। কোকিলটাকে দেখে অসুস্থ মনে হয় না। চোখের পেছনে লাল মোমবাতি জ্বেলে কি দেখে আর কি যে ভাবে কে জানে ! ছেড়ে দিলে এ কি উড়তে পারবে ? সন্দীপন ভাবলেন।
রিং রিং করে ফোনটা বাজল। " আব্দুল ফোনটা ধরতো!", বলেই মনে পড়লো আব্দুল নেই, বাজারে পাঠিয়েছেন তিনি।
উঠে গিয়ে ফোন ধরতেই উলটো দিকে রিনরিন করে উঠল সেই কন্ঠ, "আপনার কৃষ্ণকলি বলছি, কৃষ্ণকলি সেন, মনে আছে, না ভুলে গেলেন !'
‘তোমায় ভোলে এমন শর্মা এখনও কেউ ধরাধামে জন্মায় নি মতরমা !’ - মনে মনে বললেন সন্দীপন।
গম্ভীর গলায় বললেন, "বলুন"!
"কিছু ভেবে পেলেন মশাই ?"
'কোন ব্যাপারে ?"
"উঁহঃ, কায়দা !" অক্লেশে বলে উঠল উলটো দিকে সেই অজানা কৃষ্ণকলি সেন, অনায়াস দক্ষতায়, অবলীলায়, যেন সন্দীপন তার এক স্কুলের বন্ধু, আজীবন চেনা কোনো সহজ সম্পৃক্ত সম্পর্ক।
"সিরিজটা কি ভাবে শেষ করবেন, সে ব্যাপারে !"
সন্দীপন অবাক হলেন। মায়ের চেয়ে মাসীর দরদ কিঞ্চিৎ বেশি। কৃষ্ণকলি তারই দেওয়া নাম মেয়েটিকে।
সন্দীপনের মনে পড়ল প্রথম দিকে কয়েকটি ফোন এর পরে, মেয়েটির পরিচয় জিজ্ঞেস করতে, অকালপক্ক বালিকার মত বলেছিল, "শুনুন লেখক মশাই, আমি আপনার শ্রীরাধিকার মতো 'নার-নভেলি" দুধে আলতা নই যে আমার সাথে পরিচয় করে লাভ হবে, দ্বিতীয়ত, বইমেলায় আপনার ষোলোশো গোপিনীর মাঝে আমাকে আপনি খুঁজেই পাবেন না।“
"বুঝলাম শ্রীরাধিকার মতো নার-নভেলি দুধে আলতা নন, তবে কি আপনি কৃষ্ণকালি ?" মজা করে বলেছিলেন সন্দীপন।
“আমি কৃষ্ণকালি না হলেও, কৃষ্ণকলি বলতে পারেন ! বেশ, মনে করুন বনলতা সেনের মতো, আমি কৃষ্ণকলি সেন ! "
যদিও মানুষের কণ্ঠস্বরের সাথে মানুষের বাহ্যিক রূপের খুব একটা সাদৃশ্য নাও থাকতে পারে তবু কিছু মানুষের কথা বলার স্টাইলে, কন্ঠস্বরে এমন একটা কিছু আছে যে যা মানুষটিকে দেখার আগেই একেবারে প্রথম শ্রবণেই শ্রোতাকে বিশেষ ভাবে প্রভাবিত করে, আকৃষ্ট করে ! এর গলার স্বরে, বাচন ভঙ্গীতে সেরকমই কিছু একটা ছিল ! সন্দীপন টানটান হয়ে একটু সময় নিয়েছিলেন, মনে মনে একটু তৈরী হয়ে নিলেন যেন !
ঝট করে মনে পরে গিয়েছিল - কালো ! দ্রুপদ রাজনন্দিনী পাঞ্চালীও নাকি শ্যামবর্ণা বা সোজা কথায় কালো ছিলেন। এক যুগে সে এক শ্যামবর্না কৃষ্ণার জন্য আর্যভূমির বড় বড় রথী মহারথী সুর বীরেরা সব পাগল হয়ে উঠেছিলেন ! ইতিহাস মহাযুদ্ধ আর মহাকাব্যের জন্ম দিয়েছিল, "যে বিন্ধিবে, লভিবে সে কৃষ্ণা গুনবতী !"
কাশীরাম দাস, আরেকবার মহাভারতটা পড়তে হবে। কতই অজানা এক জীবনে! যেমন এই কৃষ্ণকলি সেন!!
এবারে ফোনের ওপারে রিন রিন কন্ঠে উছলে উঠেছিল হাসি, "ভালো হবেনা মশাই, বলছি শুনুন! আপনার কেষ্টা কোন মহাপুরুষ আমি জানিনা, জানতেও চাইনা, মোট কথা, জলদি জলদি শ্রীরাধিকার ব্যবস্থা করুন, কদমতলায় কেষ্টর পোষা পাখি করে বসিয়ে রাখবেন না বলে দিচ্ছি, ভাল হবেনা !"
ফোনটা কেটে গেল।
ফোনের জন্যে সন্দীপন খেয়াল করেন নি, বাইরে একটা কোকিল পশ্চিমের পুকুর পাড়ের গাছ থেকে কু কু করে ডেকে চলেছে।
বেশ ক’দিন ধরেই ডাকছে কোকিলটা। সম্ভবত সঙ্গী খুঁজছে। কিন্তু এটা পুরুষ কোকিল, মেয়ে কোকিল ডাকে না।
কিন্তু সত্যিই কি ডাকেনা? কতোটুকু জানে মানুষ? বাইরের ডাকটাই সব ? আরো কত মাধ্যম আছে ডাকার, কেই বা জানে। পুরুষ কোকিলটা নিশ্চয়ই জানে যে মেয়ে কোকিলটা এখানে খাঁচায় বন্দি। তাই সামনের কোনো গাছে থানা গেড়ে বসে কু কু করে বুকফাটা ডাক ডেকে চলেছে।
সন্দীপন খাঁচা বন্দি কোকিলটার দিকে তাকালেন, ছেড়ে দিলে কি উড়তে পারবে এটা ? কাক চিলে খেলে সন্দীপন নিজেকে ক্ষমা করতে পারবেন না।
একটা সিগারেট ধরিয়ে সন্দীপন ভাবলেন, একবার দেখাই যাক না, উড়তে পারবে কি না কোকিলটা। খাঁচাটা বারান্দা থেকে শোবার ঘরে এনে খুলে দিয়ে দেখলে হয়।
সিগারেট নিবিয়ে শোবার ঘরে খাঁচাটা এনে খুলে দিলেন খাঁচার দরজা। একটু চুপ করে বসে রইল পাখিটা, তারপর খুব সাবধানে বেরিয়ে এসে ঝটপট করে উড়ে এসে বসল পাখার উপর, তারপর আরো একবার উড়ে জানলার পর্দা ধরে ঝুলে রইলো। সন্দীপন খুব সাবধানে পাশ দিয়ে গিয়ে পর্দা টেনে নিলেন, এবারে খোলা জানালা, আবার একটা পাখার ঝটপট, কোকিলটা উড়ে গেল অতি সাবলীল ভাবে, পুকুরের দিকে।
এক মিনিটের মধ্যেই পুরুষ কোকিলকণ্ঠ উচ্ছসিত হয়ে, সহর্ষে, বসানো তুবড়ির মত উদারা, মুদারা, তারা হয়ে ছড়িয়ে পড়লো সন্দীপনের শ্রবণে, সন্দীপনের আকাশে।
জানলায় মুখ রেখে দেখলেন, মেয়ে কোকিলটা সম্রাজ্ঞীর মত ডালে বসে আছে, আর পুরুষ কোকিলটা ঠোঁট দুটি দিয়ে সযত্নে বিলি কাটছে তার ডানায়, গায়ে।
সন্দীপন এবার লেখার টেবিলে বসলেন। খাতা টেনে নিয়ে লিখতে আরম্ভ করলেন,
"বিজয়িনী, গরবিনী, স্ফূরিতাধরা রাইকিশোরী শ্রীমতি, কানাই এর দিকে ফিরে বললেন,
‘- শোনো আমার নষ্ট পুরুষ, ষোলোশো কেন, আজ থেকে ললিতা বিশাখা সব বন্ধ ! এখন থেকে তোমার স্থান আমার এই পদতলে, যা বলবো, তাই শুনবে বিনা বাক্যব্যয়ে, তুমি আমার নিঃশর্ত সেবক হলে আজ হতে। বৃন্দাবনে, আজ থেকে তোমার আগে আমার নাম উচ্চারিত হবে ! আর এই যে বাঁশী, এ আমার হলো আজ থেকে। যখনই ডাক দেবো তোমায়, যে চুলোয় থাক, ছুটে আসতে হবে আমার কাছে। আরো শোনো ---"
পরমপুরুষ পরম মমতায় পরম আদরে পরমা প্রকৃতির জানুতে মুখরাবিন্দ রেখে শ্রীমতির পাঠশালায় প্রেমের দ্বিতীয় পাঠ নিতে আরম্ভ করলেন !

pulin's picture
জাস্ট কোনো কথা হবেনা ভাষা,

pulin 3 সপ্তাহ 4 দিন আগে

জাস্ট কোনো কথা হবেনা
ভাষা, কাহিনী, উপভোগ্যতা সবই আনলিমিটেড

ফারহা's picture
সন্দীপন নামটা সিম্বোলিক?

ফারহা 3 সপ্তাহ 4 দিন আগে

সন্দীপন নামটা সিম্বোলিক? গপ্পোটা লা জবাব, সন্দেহ নেই

ঝর্না's picture
এইজন্যই তো লেখককুল সাবধান

ঝর্না 3 সপ্তাহ 4 দিন আগে

এইজন্যই তো লেখককুল সাবধান Smile
গল্পের শেষ যেন এমন না হয় যাহাতে পাঠিকাকুল বিচলিত হয়! তাহাদের হ্যাপি রাখাই মঙ্গল।

তুমুল গল্প। সন্দীপন ও কৃষ্ণকালিকে খুব ভালো লাগলো।
লেখা চাই পরেরটা।

রেবতী's picture
যাকে বলে

রেবতী 3 সপ্তাহ 4 দিন আগে

যাকে বলে অনবদ্য

জয়ন্ত ঘোষ's picture
একেবারে খাসা, পরের পর্ব কবে?

জয়ন্ত ঘোষ 3 সপ্তাহ 2 দিন আগে

একেবারে খাসা, পরের পর্ব কবে?

Arobinda 's picture
পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম। কিন্তু সেটা কবে?

Arobinda 3 সপ্তাহ 2 দিন আগে

ওই যে, তুমুল গল্প !! পরের পর্বের জন্য বেশ অপেক্ষায় রইলাম। কিন্তু সেটা কবে?

রনিতা's picture
গল্পটা উপভোগ করলাম

রনিতা 2 সপ্তাহ 5 দিন আগে

গল্পটা উপভোগ করলাম

গপ্পোবাজ 2026 's picture
সবাইকে অনেক ধবন্যবাদ

গপ্পোবাজ 2026 2 সপ্তাহ 5 দিন আগে

সবাইকে অনেকঅনেক ধন্যবাদ ! পর্ব দুই দেওয়া গেল !



নতুন মন্তব্য পাঠান

  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <b> <font color> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <small>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • You may use [inline:xx] tags to display uploaded files or images inline.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.
  • You may use <swf file="song.mp3"> to display Flash files inline