যে গল্পের কোন নাম নেই
রবি, ২০২৬-০৪-২৬ ১৩:৪২ কুকুরগুলো রাত দশটা বাজলেই তাদের কনসার্ট শুরু করে দেয়। আগে এটা খালি বিরক্তিই উৎপাদন করতো, কিন্তু কিছু দিন হল অতীন যেন সারমেয় শব্দকোষ টা উদ্ধার করে ফেলেছে।
কাল রাতে পাড়ার কালি নামের কুকুরটা বাঘার সঙ্গে তুমুল ঝগড়াঝাঁটি করেছে। কালি বলছিল, “চরিত্রহীন কুত্তা কোথাকার, ন'পাড়ার টুকটুকি কে দেখে তোর চোখ কিরকম চকচক করে, কি ভাবলি, আমি দেখিনি? আর বেসরম মাগীটাও পোঁদ নাচিয়ে নাচিয়ে তোর সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আমি সব দেখেছি ।” বাঘা কাঁউকাঁউ করে কি একটা বলল, কিন্তু কালি এমন চিৎকার করল যে বাঘার গলা শোনাই গেল না। বাঘার মা দূরে বসে সবই শুনছিল। সে কালির এইরকম চিৎকার চেঁচামেচি দেখে হঠাৎ গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,"তা তোর চরিত্রই বা কিরকম র্যা? বাঘা, আমার বোকা-শোকা ছেলে, ও অত-শত বোঝে না ; কিন্তু তো আমি সবই দেখি, সব জানি। তুই সুযোগ পেলেই লেঙড়ুর পোঁদে পোঁদে যে ঘুরিস তার বেলা? তা কি পাড়ার কেউ জানে না, ভেবেছিস?"
অতীনের অস্বস্তি বাড়তে থাকে। সারমেয় উচ্চারিত, যে কোন শব্দ ইদানীং অর্থবহ হয়ে তার কানে বেজে উঠছে। অতীন ই এন টি দেখিয়েছে কিন্তু ডাক্তারবাবু কানের ভিতর জমে থাকা খোল ছড়া আর কোন উপসর্গ দেখতে পান নি, উলটে তিনি বলেছেন এটা আপনার মনের সমস্যা, সাইকো-থেরাপিস্ট দেখান।
কেউ কেউ কানকাটা, কানপাতলা, কানভারি নানা রকম কানের দোষ নিয়ে জন্মায়, সেগুলো কেউ ই সমস্যা বলে মনে করেনা। এ সব নিয়েই দিব্য জীবন কাটায় তারা। অতীনের সেসব সমস্যাও ছিল না। ছোটবেলা থেকে কতই না অপ্রিয় কথা শুনেছে সে, হয়ত কিছুক্ষণ খারাপ লেগেছে তারপর সব স্বাভাবিক হয়ে গ্যাছে আবার।খুব ছোট বেলায় পরীক্ষার রেসাল্ট বেরোলে গার্জেন কল হল। ক্লাস টিচার বাবা কে ডেকে বললেন, “পড়াশুনোয় মন নেই ছেলের, এ ভাবে চললে ক্লাস ফোর পেরোবে না। আপনারা বাড়িতে একটু নজর দিন ।” বাবা তারপর থেকে আর যেতেন না গার্জেন কল হলে, মা যেতো । বাড়ি ফেরার পথে মা গজগজ করতে করতে ফিরতো, “তোর বাবা কে কি জবাব দেব আমি! মানুষ টা মুখের রক্ত তুলে উপার্জন করে, তোর পড়াশুনোর পিছনে কত খরচ, আর তুই নির্বিকার ! শুধু খেলে বেড়ালে দিন চলবে?” ক্লাস এইটের পর থেকে অতীনের পড়াশুনো নিয়ে আর কোন অভিযোগ আসে নি স্কুল থেকে। উচ্চ মাধ্যমিক পেরিয়ে অতীন যখন ফিসিক্স নিয়ে গ্রাজুয়েশান করতে চলে যায় কোলকাতার আশুতোষ কলেজে ওর সহপাঠী বন্ধুরা একবার এসেছিল ওর বাড়িতে। ঘরের একটা দেওয়াল আলমারীতে অনেক গুলো কাপ, ট্রফি, মেমেন্টো রাখা দেখে ওরা জিজ্ঞাসা করে “মাসীমা, কাকু বুঝি স্পোর্টস ম্যান ছিলেন?” অতীনের মা হেসে বলেন “ও গুলো তো অতীনের, ছোটবেলার, খেলাধুলো থেকে পাওয়া। ওর বাবা সব সাজিয়ে রেখেছে।” বন্ধুরা আকাশ থেকে পড়ে, “অতীন আর খেলাধুলো! ক্যারাম ছাড়া আর কোন খেলা ওকে তো খেলতে দেখিনি মেসে!”
প্রত্যুষাও যেদিন অতীন কে প্রত্যাক্ষান করে, সেদিনও ওর খুব খারাপ লেগেছিল। প্রত্যুষার কথা গুলো কানে বাজছিল অতীনের। “শোন্ অতীন প্রেম আর বিয়ে এক ব্যাপার নয়। বিয়ে একটা দীর্ঘমেয়াদী বন্দবস্ত, প্রমিকের চরিত্র আর বরের চরিত্র এক হয়ে গেলে প্রেম বা বিয়ে কোনটাই টেঁকে না। তুই আমায় ক্ষমা কর, ঠিক সময়ে আমার চাইতে অনেক ভালো কোন মেয়ের সাথে তোর সংসার হবে একদিন, সেদিন বুঝবি।“ বলে ঝড়ের মত রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল প্রত্যুষা।
কথা গুলোর মানে সেদিন বোঝে নি অতীন। প্রেমিকের চরিত্র আর বরের চরিত্র! না কি বিয়ের তুল্যমূল্য নিশ্চিন্ত নিরাপত্তা আড়ে বহরে বারো-হাতি হবার কথা বলতে চেয়েছিল প্রত্যুষা? ভালোবাসার সাথে সমঝোতা করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নাম যদি সংসার হয়, সে সংসার কি খুব সুখের? অতীন এর পরে আর কারো প্রেমে পড়েনি। কখনো কখনো দু একজন কে ভালো লাগলেও তার কত টা শরীরের আর কত টা মনের টানে, সে হিসাবে তার আগ্রহ ছিল না।
সীমার সাথে অতীনের বিয়ে হয়েছে আজ চার বছর, আত্মীয়ের মাধ্যমে দেখাশোনা করেই বিয়ে। সন্তানাদি না থাকলেও সামাজিক ভাবে দেখলে ওদের দাম্পত্য মোটের উপর গড় পড়তা বাঙালির চোখে স্বাভাবিক দাম্পত্য। সীমার অন্ন বস্ত্র বাসস্থান এবং দৈনিক স্বচ্ছল বেঁচে থাকার জন্য আর যা যা দরকার তার অনেকটাই দিতে সক্ষম অতীন বিনিময়ে সীমার শরীর ছেনে দেখার সাপ্তাহিক গেট পাশ পাওয়ার অধিকার তার বহাল আছে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে কখনো কখনো খটাখটি হলেও প্রেম নিয়ে তাদের মধ্যে কোন ইল্যুউশান নেই,তবে দু তরফেই কিছু দায় দায়িত্ব আছে, অন্তত অতীন তাই মনে করে। তবুও সীমার ব্যবহার মাঝে মাঝে অদ্ভুৎ ঠেকে অতীনের। সীমা নিরাপত্তার সাথে সাথে যেন আরো কিছু বেশি প্রত্যাশা করেছিল অতীনের কাছে। আনুগত্য আর সহমর্মিতা যা নাকি যে কোন বিবাহের অত্যাবশ্যকীয় বাই প্রোডাক্ট এবং সাহচার্যে ঐকান্তিক থেকে তার নির্বাচিত দ্যূতী লোকসমক্ষে ফেসবুকের পাতায় প্রদর্শন টাও যেন স্বামী হিসাবে অতীনের অবশ্য কর্তব্য! অতীন ভেবে পায় না, প্রেম হীন বিবাহে আনুগত্য না হয় একটা পালনীয় ক্লস হতেই পারে কিন্তু সহমর্মিতা ও প্রেমের সম্প্রচার তাও আবার গন মাধ্যমে কি করে একটা দাম্পত্য শর্তে যায়গা পেতে পারে! বিশেষ করে যে বিবাহ প্রেমের ফসলই নয়, নেহাতই একটা আইনানুগ অত্যাবশ্যক লৌকিক কন্ট্রাক্ট মাত্র!
তাই সীমা যখন বলে, “আমার যেমন কপাল এমন যেন শত্রুর ও না হয়! রাস্তার কুকুর বেড়াল ও একসাথে থাকলে দুটো খেতে পায়! কিন্তু শুধু খাওয়া পরা টাই মানুষের জন্য সব হতে পারে না!”
অতীন তখন বলে, “হ্যাঁ তবে কুকুর বিড়াল কে বিবাহযোগ্য প্রমানে আকর্ষনীয় ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স গড়ে তুলতে হয় না আর কালেভদ্রে যৌনতার জন্য দিনে দুবার করে আনুগত্যের প্রমান দেওয়ার ও রেওয়াজ নেই সেখানে,কাজেই এক তো নয়ই!” বলে পাশ ফিরে শোয়।
সীমার ঘুম আসে না, এই সব সময় তার প্রতাপের কথা খুব পড়ে। বিকেলের দিকে ছাতে উঠলেই সীমা দেখতো পাশের বাড়ির জানলা দিয়ে এক জোড়া উৎসুক চোখ তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে । ক্লাস এইট থেকে কলেজ পাশ করা অব্ধি এর ব্যতিক্রম হয় নি। পড়শী হবা্র সুবাদে ছল ছুতোয় সীমাদের বাড়ি আসার সুযোগ পেলেই প্রতাপ চলে আসতো। সীমার মা ও খুব পচ্ছন্দ করতেন প্রতাপ কে। বাড়িতে ভালো মন্দ রান্না হলেই ডাক পড়ত প্রতাপের। প্রতাপ যে খুব সপ্রতিভ ছিল তা নয়, সীমাকে দেখলে তার বাক্যস্ফূর্তি বন্ধ হয়ে যেতো বরং। অপলকে সে চেয়ে থাকতো সীমার দিকে। সীমার চোখে চোখ পড়ে গেলেই চোখ নামিয়ে নিত লজ্জায়। সীমার সাথে একই কলেজে পড়া এক বছরের সিনিয়ার প্রতাপ, আমায়িক পরোপকারী, গানের গলা টা অপূর্ব। বাপ মরা মা আর ভাই দের সাথে নিয়ে থাকা এই ছেলেটার উপর সীমার মায়ের একটা টান ছিল। সীমার প্রতাপ কে যে একই রকম ভালো লাগত তা নয়, বিশেষ বিশেষ সময়ে যেমন কলেজ সোশ্যালে উদ্বোধনী গান্ টা গাওয়ার সময়, আর ওই ছাতে ওঠার সময় প্রতাপ কে অপরিহার্য্য মনে হত সীমার। যেদিন সীমার মা প্রতাপ কে সীমার বিয়ের খবরটা দিলেন, তিনিও লক্ষ্য করেছিলেন প্রতাপের চোখের তারা আর ঠোঁট সামান্য কেঁপে উঠে যেন স্থির হয়ে গিয়েছিল। প্রতাপ সব শুনে মাথা নিচু করে কাজ থাকার আছিলায় সীমাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল দ্রুতই। বিয়েতে বাড়ি শুদ্ধ নিমন্ত্রণ থাকা সত্বেও প্রতাপ আসে নি। বিয়ের পরে বাপের বাড়ি গেলে সে ছাতে উঠে প্রতিবার দেখার চেষ্টা করেছে কেউ তার জন্য অপেক্ষায় আছে কি না। কাউকে দেখতে না পেলেও তার মনে হয়েছে, অলক্ষ্যে এক জোড়া চোখ আজ ও তার গতিবিধির খোঁজ রাখে ঠিক। ঘুম আসে না সীমার, এ কোন জীবন! এই জীবনই কি সে চেয়েছিল? আর্থিক নিরাপত্তা টুকু থাকলে হয়ত সংসার ভেঙে বেরিয়ে গিয়ে একা থাকার একটা সুযোগ সে নিতে পারতো, শরীর সর্বস্য একটা মানুষের সাথে এত গুলো দিন কি ভাবে কাটাবে সে!
সীমা ঘুমোলে ওর নাক ডাকার চাপা শব্দ টা টা লয় পরিবর্তন করে। অতীন বোঝে সীমা ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমন্ত সীমাকে অতীনের প্রত্যুষার প্রতিনিধি বলেই মনে হয়। যারা নিরাপত্তা সুরক্ষিত করে জীবনের বাড়তি আস্বাদ হিসাবে প্রেম দাবী করে । অতীনের ইচ্ছা করে জীবনের হিসাব কড়ায় গন্ডায় বুঝে নিতে। ঘুমন্ত সীমার বুকের উপর সে হাত রাখে ঘুমের আছিলায়। সীমা বিরক্তির সাথে ঝটকা দিয়ে সে হাত সরিয়ে দেয়। অতীন উঠে পেচ্ছাপ করতে যায়।
কুকুর গুলোর খুব চিৎকার করছে রাস্তায়।
কালি র গলা যেন নাদ ব্রহ্ম- “ যা না কুত্তা, যাকে ভালোবাসিস তার কাছে গিয়ে থাকলেই তো পারিস, আমার পিঠে চড়ার এত শখ কিসের!”
বাঘা ভারী গলায় বলে ওঠে, “আয় মেরি জোহরা জবি, তুঝে মালুম নেহি, তু আভি তক হ্যায় হাসিন আউর ম্যায় জওয়ান”
বাঘার মা পাশ ফিরে শুতে শুতে বলে “ সব মদ্দের একটাই ছক ,বেওকুফ পিল্লা!”
অভ্যস্ততার হয়ত একটা মায়া আছে, যা একদিকে যেমন খেপিয়ে তোলে আবার অন্যদিকে প্রলেপ ও লাগায়। অতীন পেচ্ছাপ যন্ত্র টা ধরে টয়লেটে দাঁড়িয়ে থাকে। জানলার ওপারে চাঁদের সাম্পান ভেসে যায়।
নিরক্ষর
- নীল-এর অন্যান্য কবিতাপাতা
- এই পাতাটির ক্লিকসংখ্যা 330





আকাশ নেরুদা 2 সপ্তাহ 4 দিন আগে
দুর্দান্ত লেখা , যা অনেককে ভাবিয়ে তুলতে সক্ষম ।
হলুদ 2 সপ্তাহ 4 দিন আগে
অনবদ্য
jaydeep 2 সপ্তাহ 4 দিন আগে
সার্থক গল্প
ঝর্না 2 সপ্তাহ 4 দিন আগে
দিব্যি লেখা, নীল। দারুন গদ্য। আগেরটাও পড়লাম।
সিয়ারা 2 সপ্তাহ 4 দিন আগে
"অভ্যস্ততার হয়ত একটা মায়া আছে, যা একদিকে যেমন খেপিয়ে তোলে আবার অন্যদিকে প্রলেপ ও লাগায়"
মুশকিল সেটাই উপশমও সেটাই - কখন কোন দিকে পাল্লা ভারি হয়ে যায় কে জানে!
ASIT KUMAR ROY 2 সপ্তাহ 4 দিন আগে
অনবদ্য লেখনী।
অভিজিৎ 2 সপ্তাহ 4 দিন আগে
যে গল্পের কোন নাম নেই.....
অভিজিৎ
বনলতা 1 সপ্তাহ 5 দিন আগে
লেখাটি নাড়া দিয়ে গেল, নীলদা
রেবতী 1 সপ্তাহ 5 দিন আগে
চমৎকার বিশ্লেষণ, আর উপভোগ্য গদ্য
নতুন মন্তব্য পাঠান