বরাভূম
- (রক্তিম)
এ এক লাল মাটির দেশ
এখানে প্রকৃতি রুক্ষ তবু অন্তর সবুজ
যখন এখানে পলাশ ফোটে রক্তের মত লাল
সে যেন এক উন্মত্ত যৌবন তরঙ্গ
কি এক নেশায় ডাক দেয়
ওরে তোরা কি কোথায় আছিস
আয় ছুটে ছুটে আয়।
নিজেদের নতুন করে খুঁজে পেতে
জীবন শুরুর গান গাইবি যদি আয়।
মেয়ে মরদে চাঁদনী রাতে
উছল আনন্দে নাচবি যদি আয়।
মুখোশ যত আছে সব ফেলে দিয়ে আয়।
নতুন সুরে নতুন ভাষায়
সৃষ্টির গান গাইবি আয়।
"জীবনের বৈঠা"
(ঘরে বাইরে সকল
মেহনতী নারীদের জন্য)
জীবন স্রোতে শক্ত হাতে
যে টানে জীবনের বৈঠা,
দিনশেষে সেই নারীর কপালে
জোটে লাঞ্ছনা আর খোঁটা।
বাইরে সে লড়ে ঝড়ের
সাথে ঝরায় গায়ের ঘাম,
তবুও সমাজ-সংসারে জোটে
না তো শ্রমের সঠিক দাম।
ঘর সামলে- জগত সামলে
ক্লান্ত যখন দেহ,
তুচ্ছ করে নিজের ব্যথা
বোঝে না তো কেহ।
নারী দিবসে সম্মান শুধু
একদিনের তরে নয়,
নিগ্রহ আর বঞ্চনা মুছে
নারী যেন মানুষ হয়ে রয়।
স্পর্শ
রেখে দিতে চাইলে রেখে দিও !
তুলসী তলায় একাকী একটি প্রদীপের মতো ,
ঘন বনভূমিতে জোনাকির আলোয় ,
মনের জলাভূমিতে ভাসমান দ্বীপে,
কিংবা চোখের ওই জ্যোত্স্নায় ,
রেখে দিতে চাইলে রেখে দিও !
যেভাবেই হোক রেখে দিও ।
জীবনের দীর্ঘ রাত্রি শেষে
শেষের রেশ ধরে থাকা স্বপ্নের ভেতর ,
ব্যথাতুর হৃদয়ে অনন্ত ভালোবাসায় ,
সিঁদুরে বিকেলে নীড়ে ফেরা পাখির ডানায় জড়ো হওয়া
আগামী সকালের গান হয়ে জেগে ওঠার প্রতিশ্রুতির মতো ,
রেখে দিও !
যেভাবেই হোক রেখে দিও ।
ঝড়ো হাওয়ায় উঠোনের কোনায় জমা পাতার ভেতর ,
বন্যা কবলিত এলাকায় ত্রাণের শিবিরে স্বস্তির নিঃশ্বাসে ,
পলাশে পলাশে লাল হয়ে ওঠা গাছের ছায়ায় ,
কিংবা ওই বুকের তপ্ত ভূমিতে দহনের কাব্যগাথায় ,
রেখে দিতে চাইলে রেখে দিও !
যেভাবেই রাখতে চাও , রেখে দিও ।
শুধু খেয়াল রেখো ,
শেকল আমার ভীষণ অপছন্দের ।
হেইগং , মণিপুর --- 07/03/2026
সন্ধ্যে হয়ে এলে ফিরে যায় কাপড়কাচা মেয়েগুলি নিজের বাড়িতে। বাড়ি বলতে পাহাড়ের উপর একফালি ম্যাগিঘর, সারমেয়সঙ্কুল। তারপর অনাবিল উপত্যকা। মাঝে মাঝে খুবলে নেওয়া ভূমিরূপ। যেন পাথর খুলে নিলো কেউ বিয়েবাড়িতে উপঢৌকন দেওয়ার মতো কোনো ন্যাপথলিন সুবাস ছিল না বলে। সন্ধ্যে হলে সুচিস্মিতা হয়ে ওঠে মেয়েরা। তাদের একটানা প্রলাপের মতো কথাগুলি বিদেশী ভাষার কবিতার মতো শোনাতো। নীল বোতল কাটিয়ে ফেলে দুটি রাত্রি একটা নয়ানজুলির ভেতরে। একটা কুকুর বার দুয়েক শুঁকে যাওয়া ছাড়া কোনো ডিটেকটিভ চোখে পড়েনি তার। অথবা কেই বা থাকবে এই অকুস্থলে ?এই রুকসানা প্রপাতগুলির স্নেহে বিগলিত হয় সমস্ত যুক্তি। ধুয়ে যায় মনস্তত্ত্বের ধুলো। এই নীল জলের আধারগুলিতে মাঝে মাঝে শোনা যায় হুরের হাসি। ঘুম ভেঙে যায় তার। বুঝতে পারে না কিভাবে কাটবে এই শিশিরস্নাত বিভাবরী। গোধূলি সব ফুরিয়ে গেছে কিভাবে। শহরের অগোচরে, মিটিংয়ের হিতাহিতে ফুরিয়ে যায় কত গোধূলি। মনে পরে তার সেসব কথা। ব্যাকপ্যাকের এক ধারে উল্লম্বভাবে কত মহার্ঘ গোধূলি পেরিয়ে সে সেঁধিয়ে যেত হিবিসকাস কোয়ার্টারগুলিতে।
ক্রমশ উজ্জ্বলতা হারিয়ে ফেলে শীত
কবেকার ব্যালকনি বেয়ে উঠে আসে অধঃপতিত রোদ্দুর
জেগে থাকা গান, সুরেরও বয়স হল কত ...
বিস্কুটের উপরে ছড়ানো চিনির গুঁড়ো, আহা ‘নাইস’
অতীত মিষ্টি ছিল কেমন?
হ্যাভ আ নাইস ইভনিং, এই বলে
লাল ডাবল ডেকারে চড়ে সুলতা অপসৃয়মান
আর শহরের মেঘেরা বিষাদবিলাসে মরে ...
মেধাবীরা ঘুণাক্ষরে বইমেলা শাসন করে, আর
একান্ত যারা নিভৃতচারী, ভীরু কবিতায় ডুবে থাকে
তবু জন্ম নেয়না তাদের পান্ডুলিপিমালা ...
সব স্মৃতি একদিন হারানো রেকর্ড প্লেয়ার, কালো টেলিফোন
সুলতা সেন, যে সুবাসের ভিতরে তার ট্রু অহিফেন
এক জীবন কেটে গেল কী যে নেশায়, শৈত্যকে পশমে
পোষ মানানো যায়, আর কামনার শ্লথ কুয়াশাকে? ...
কাকে আর কে বলতে পারে, প্রাচীতে কাল নতুন সুচিত্রা-উত্তম
আপনি কি ফ্রি থাকবেন?
এই দেহ থেকে হারিয়ে নতুন কোনো দেহে
যাওয়ার আগে, হে সেন সুলতা,
বলে যেতে চাই, নিষ্ফলা কবিতার বীজ নিয়ে
আবার আসিনা যেন, বারবার নিহতে হতে হতে
যে কিশোর জেনে যায় শীতের ব্যালকনি মানে
উষ্ণতাবিহীন আশার দুপুর
বাসের ভিতরে ছড়িয়ে পড়া বিনম্র কবরীর ঘ্রাণ
বুকপকেটে নিয়ে ফিরে আসা, আর
এলোমেলো হয়ে যাওয়া ট্রাফিক নুপূর
সে ছাব্বিশ পুনরায় কেন হবো, কেন হবো
ভারাক্রান্ত অভিমান-জর্জর মেলোডির অক্ষম সুর ...
সবটাই একটা বিভ্রম, সবদিকে ঝোঁক
আসলে মানুষের স্বাদ সমুদ্রের চেয়েও লোনা
যতই বসন্ত পার হোক
মাথার অন্ধকারে ডুবে, ঘোলাজলে যে মাছ
পাখনার কৌশলে রেখে দেয় টিকে থাকার দাগ
সেই ই চিনেছে শুধু শ্লাঘা ভেঙে জমেনা বরফ
আর সবকিছু ক্ষয়ে গেলেও রয়ে যায়
শ্যাওলা হয়ে বাঁচার হরফ...
সর্পিল সময় তাই শূন্য লেখে লিখুক
সরল বাতাস দাখিল করুক নাম
ঘরের ভিতর ছায়ারা বাঁচুক দুধেভাতে
আমাদের তো জানালা চাই শুধু
চোখ সেঁকার জন্য খোঁজা
হরফের দরদাম
সমুদ্র বরফ রাখুক
লোনা স্বাদের প্রবাদে
আমরা তো সৈকত চেয়েছি শুধু
বারবার আমাদের স্থবির উৎসবে
এই কালি ,এই বুনেটি আত্মহনন
মাকুর দাগের মতো রেশ
ঘরের ভিতর ছায়ারা বাঁচুক দুধেভাতে
লাভা মেখে এই রয়েছি বেশ
এই গুল্মযাপনের দেশে ,চিঠিরা অমরত্ব পাক
সবুজ কালির মতো স্মৃতিও আবার পিনকোড হারাক
প্রতি সপ্তাহে তিনটি পত্র পাই,
ঈশ্বরের,
একটি বাংলায় লেখা,
অপর দুটি অজানা কোন ভাষায়,
আমারটা পড়ি খুব মন দিয়ে,
এক প্রশ্নমালা
কতটা মহাকাশ ছুঁয়েছি
কত নক্ষত্রকে মরে যেতে দেখেছি
কত গ্রাম পুড়ে শহর হল
কত সিন্ধু শুকিয়ে রেলপথ হয়ে গেল
কত চিতা কাঠ ছাই হল
কত বাতাস ঝরে পড়ল হিম হয়ে
কিংবা তুষার হয়ে
পত্রে ছিল না
কত জেলে জেগে রইল রাত বিরেতে
লন্ঠনের আলোয় ঝুম বর্ষায়
গহীন গাঙে
কত নাপিত খদ্দের না পেয়ে
বাতাসা আর খই নিল বাকীতে
অভূক্ত কতটা মুখ
কত মাঝি আনায় লোক পার করতে করতে
রাত ভোর করে ফেলল
জোটে তব যদি এক রত্তি মোটা চাল
পত্রে নেই কত বাঁশ বাগান চাঁদের চলার পথে হানা দিল
আলোহীনকে আলো না দিতে
কত ধুনুরি তুলো না পেয়ে কালের স্রোতে মিশে গেল
কত তাঁত ধনুষ্টংকারে কাবু হল
কত বাঁশরী আর বাজলো না
লাউয়ের খোঁজে কত বাউল দেশান্তরী হল
তরমুজ মাঠেই মরে গেল বলে
কত চাষী নিখোঁজ হল
পত্রে আছে নিমেষেই আমার কলম কতটা
ইমারত মাটিতে পুঁততে পারল,
প্রতি সপ্তাহে আমি তিনটি পত্র পাই,
ঈশ্বরের,
সেখানে নেই কোন অনার্যদের গল্প।
আমিও বাবার মত হয়ে যাব
জানি সেদিনটা দুরে নয় খুব,
প্রশ্নটা প্রশ্নই থেকে যাবে
স্মৃতিরা আঁধারে দেবে ডুব।
শাত্-ইল-আরবটা যে চিনিয়েছে
অটোমান, পাশা বা আতাতুর্ক,
চলমান অক্ষর আবছা
নিখুঁত স্মরণে আজ তার খুঁত।
সৃষ্টির সাথে লাল বৃষ্টি
ধুয়েছে কোথাও যদি অঙ্গন,
ঘামের ফোঁটা মেশা লাল রক্তে
শ্যামলিমা পলাশের অঙ্কন।
সত্তর দশকটা হলে ঝরা রক্তের
আগের দশকে পাওয়া কাজটা,
ইতিহাস গড়া যার সাক্ষ্যে
বিদ্যুতে শানানো সে বাজটা।
যে স্বপ্নের মায়া জাল বুনেছি
বাস্তব দেখিয়েছে সে লোকটা,
কাস্তে-হাতুড়ি তফাৎ পড়ে বোঝানো,
চেনানো সোভিয়েত চীন দেশটা।
নাগাড়ে কান রাখা বড় চোখে
কাল ছোট টিভিটা পাল্টেছে,
এলইডির স্ক্রিনে তবু চোখ নেই
সেদিনের ইতিহাস বদলেছে।
শ্রীলতা শ্রীমতীর ধারে লাল গেটে
বুলগানিন আর ক্রুশ্চেভ,
আদতে পশ্চিমা ছোটেলাল
পুবেতে একদা যার এনক্লেভ।
আউসভিৎস হলোকস্ট আইকম্যান
ফুয়েরার মুসোলিনি গোয়েরিং,
প্রচারের মিথ্যেতে গোয়েবলস
অভিশাপে চোকানো সব ঋণ।
সুকার্ণো নাসের টিটো জোটনিরপেক্ষ
পচা গম পাঠানোর ইতিহাস,
সাপ ব্যাঙ দুই গালে আজও চুমু
একই কনট্রা স্ক্যান্ডালে খেলা তাস।
কালকের ছায়া দেওয়া বড় গাছটা
কোটরে কোটরে ক্ষতে শোয়ানো,
আমার আকাশে মেঘে যৌবন
চমকে ধমকে চোখ রাঙানো।
আজ সব শব্দেরা থমকে
সব স্মৃতি লুকোচুরি খেলছে,
ভাসা চোখে তাকানো ভাষাহীন
আমাকেও কেউ বুঝি ডাকছে।
থেকে গেলো একটা নীল বোতল বনানীতে। আতরমাখা রাস্তাগুলি অথবা ধূলিময় বনেটে দিনতিনেক ঘুরতে থাকা নীল বোতলটি ফেলে এলো মানুষেরা বনানীতে। তেমন কথা ছিল না ,নেহাতই এক দুৰ্দৈবে ঘটে গেলো। সে কখনো এইভাবে দিন কাটায়নি। তার জড়ত্বের কথা জানতো সে , তবুও টেবিলের পৃষ্ঠদেশে স্থাণু হয়ে অথবা কখনো কখনো অঘটনে মেঝেতে চিৎপাত হয়ে পড়ে থাকতে মন্দ লাগতো না। কখনো কখনো এমন হয়েছে যে প্রবল ত্বরায় ঝরে পড়েছে সে মালিকের গায়ে ,অথবা আটকে গেছে তার শ্বাসনালীতে। তারও যে একটা বর্ষাকাল আছে ,সে খবর জানিয়ে দিতে চাইতো সে তার মানবিক শিকলগুলিকে। কখনো এমন হয়েছে শীতের রাতে কেউ তাকে ফেলে এলো বারান্দার চেয়ারে। সে জানতো তার স্থবিরতার কথা। তাই সেই হিমশীতল রাতগুলি কাটিয়ে দিয়েছে জেগে জেগে। দেখেছে কিভাবে বাদুড় উড়ে বেড়ায় তমিস্রাতে। অথবা ঋজু লাইটপোস্টে বসে থাকে প্যাঁচা। কিন্তু ,কখনো ভাবেনি এইভাবে জঙ্গলাকীর্ণ উপত্যকায় ফেলে আসবে তাকে ট্রেকের শেষে মানুষেরা।
মর্মর প্রাসাদ
- (রক্তিম)
আচ্ছা!
গরিবের হাড় দিয়ে প্রাসাদ বানানো যায় না!
তবে তাই হোক।
নবতম আশ্চর্যের আবিষ্কার হবে সে প্রাসাদ।
এই বিশ্ব বোধহয় তাই দেখতে চায়।
জগতে যত অসহায় মানব রয়েছে
আধপেটা ভুখা স্বপ্ন-হারানো দিশাহারা
ক্রীতদাস সম বেঁচে থাকা সব,
সাদা কালো জাত বেজাত উঁচু নিচু বিভেদে
হোক সবায়'কে এক্কেবারে
মরনের দিকে ঠেলে দেওয়া।
তাঁদের মরণের পর অযুত জমানো হাড়ে
রাতারাতি একটা প্রাসাদ রচনা হোক।
শ্বেত শুভ্র রাজহংসের মতো নয়নাভিরাম।
চাঁদের আলো যেন মুখ লুকায় লজ্জ্বায়
দেখলেই সে মর্মর প্রাসাদ।
আহা!
অহংকারী আছে যত দেশের মাথা
দেখবে আর চক্ষু সার্থক হবে তাহাঁদের।
গর্ব করে বলতে থাকবে বিজ্ঞাপনী ভাষায়
এই আমাদের ক্ষমতা প্রদর্শনের
আশ্চর্য মর্মর মঞ্জিল প্রাসাদ।
দেখো আর দেখতে থাকো, স্তুতি গাও মম।
মাথা নত করে থাকো, কীটের মতো বাঁচো
এতটুকু আগুন যেন না থাকে আঁধার অন্তরে।

