দুপুরে খাওয়ার পর তার বিশ্রামের সময়। দিনে ঘুমানোর অভ্যেস তার কোনোকালেই নেই। তিনি তার ইজিচেয়ারটায় শব্দছক নিয়ে বসেন, টুকটুক করে বাংলা ইংরেজি কাগজের শব্দছক দুটো সমাধানের চেষ্টা করেন। অধিকাংশ দিনই সে দুটোই সম্পন্ন করেন, ভাল লাগে, বেশ একটা তৃপ্তি লাগে। আজও সেটা নিয়ে বসলেন। কিন্তু বেশিদূর এগোতে পারলেন না। আসলে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে আছে। মন বসাতে পারছেন না। হঠাৎ ফোনটা একবার কেঁপে উঠে টুংটুং করে উঠলো। একটা হোয়াটসআপ মেসেজ এসেছে। তুলে দেখলেন শশীকলা, মানে তার আধা আমেরিকান নাতনি, সংক্ষেপে শশী, ইংরেজি নাম স্যাস !
লিখেছে, "মাই ডিয়ার বয়ফেন্ড, তোমাকে অনেক দিন আগে আমি একটা ফেসবুক রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিলাম, সেটা কেন একসেপ্ট করছো না। আমি আমার সমস্ত বন্ধুদের বলেছি যে আমার গ্র্যান্ডপা ম্যাথেমেটিক্স জায়ান্ট, "জন সেড্রিক গ্রিফিথস অ্যাওয়ার্ড" রেসিপিয়েন্ট, আর কেউ সেটা বিশ্বাস করছেনা। প্লিজ ইমিডিয়েট একসেপ্ট করো !"
মৃদু হাসলেন আলোকরঞ্জন, হ্যাঁ এদেশে অঙ্কশাস্ত্রে অবদানের ওপরে বিশ্বস্বীকৃত এই অ্যাওয়ার্ডের কথা আর মূল্য কটা লোকই বা জানে। যখন সেটা পেয়েছিলেন তখন ছিল সাধনার যুগ, সততার যুগ, হুল্লোড়ের যুগ নয়, সস্তা পাবলিসিটির যুগ নয়। কার কত ফলোয়ার, কে ব্যস্ত রাস্তায় টেবিল পেতে বসে সভ্য দেশের নিয়মকানুনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে মদ খেয়ে কত মিলিয়ন লাইক পাচ্ছে বা দিনের মধ্যে কে কতবার অন্তর্বাস বদলানোর সেলফি দিয়ে, বোতল দিয়ে গোপনাঙ্গ ঢেকে ছবি চেপে ফলোয়ারের সংখ্যা বাড়াচ্ছে সেই অন্তঃসারশূন্যতার যুগ ছিলনা সেটা। মফস্বল শহরে বসে তার এই নিরলস সাধনার স্বীকৃতির খবরটা বেরিয়েছিল দেশের কয়েকটা কাগজে। আর অভিনন্দন এসেছিল দেশের ও বিদেশের অতি বিদগ্ধ ব্যক্তিত্বদের থেকে, দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তিনি নিজেও সেটা ফলাও করে কখনো বলেন নি, তবু খবরের কাগজ দেখে শহরের শিক্ষিত সমাজ তাকে সম্বর্ধনা দিয়েছিল। আর অন্তরঙ্গ মহলে দু চারজন তার স্বীকৃতির গর্বে গর্বী বা গরবিনী হয়েছিল। বাবা, মা, আর অন্নপূর্ণা ! মেডেল নিয়ে বিদেশ থেকে ফেরার রাতে সেটা অন্নপূর্ণার গলায় পরালে সুন্দরী মেয়েটা নাকের পাটা ফুলিয়ে বলেছিলো, "তোমার গরবে গরবিনী হাম--!"
মনে পড়তে নিজের মনেই একটু হাসেন আলোকরঞ্জন। শশীকলার মুখের কিছুটা মিল আছে অন্নপূর্ণার মুখের সাথে। খুব ছোটবেলায় কলকাতায় এলে শশীকলা যখন অভিমান হলে রাগ করে ঘাড় ঘুরিয়ে বসতো, অন্নপূর্ণা হেসে ফেলত, বলতো "এইটুকু পুঁচকের রাগ দেখো, আবার আমার মতো ঘাড় ঘুরিয়ে বসা হয়েছে, হু ! তেঁতুরি !" আসলে নিজেকেও অন্নপূর্ণা তেঁতুরি বলতো আড়ালে, সেটা কেবল আলোকরঞ্জন জানেন।
আলোকরঞ্জনের হৃদয়ের গুরুভার সামান্য হলেও একটু কমলো এই সব ভাবতে ভাবতে। তিনি উত্তর দিলেন, "হ্যাঁ, তোমার বয়ফ্রেন্ড একটু বুড়ো হয়েছে তো, তাই একটু স্লো হয়ে গেছে, বাট উইল ডু ইট ইন দি নেক্সট এভেইলেবলে চান্স !" নাতনি গতবারে কলেজ আন্ডারগ্রাজুয়েট প্রোগ্রাম জয়েন করেছে, প্রিয় সাবজেক্ট অঙ্ক ! ব্যাঙ্গালোরে ছোটোছেলের দুই ছেলে, বড়োটাও এবারে হাইস্কুল জয়েনও করবে, সেটাও অংকে তুখোড় ! বংশগতি ! আলোকরঞ্জন সামান্য হলেও বুকে গভীরে একটু সুখ অনুভব করলেন। ছোটো ছেলেটার ক্লাস সেভেন। সেটা এখন থেকেই খুব গম্ভীরবাবা, দেখে বোঝা যায় বড় হলে আলোকরঞ্জনের মতোই চেহারা হবে, শালপ্রাংশু মহাভুজ ! অন্নপূর্ণা আলোকরঞ্জনকে মাঝে মাঝে "শালপ্রাংশু মহাভুজ” বলতো। আলোকরঞ্জন যৌবনে বেশ সুপুরুষ ছিলেন, এখন বয়স হলেও সেটা বোঝা যায়।
আলোকরঞ্জন ইজিচেয়ারটা ছেড়ে উঠলেন, ভাবলেন গদাইকে ডাকেন, তারপর সেটা না করে নিজেই টেবিলের কাছে গিয়ে কম্পিউটারটা খুললেন। বহুদিন ফেসবুকটা খোলা হয়না, প্রায় মাস ছয়েক তো বটেই। তিনি এসব সোশ্যাল মিডিয়ায় খুব একটা থাকেন না। ভাবলেন ফেসবুকটা খুলবেন, কিন্তু কম্পিউটারটা খুলতেই গুগলে গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ওপরে একটা ইন্টারেস্টিং আর্টিকেল দেখে পড়তে শুরু করলেন, তারপর এই সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক খবরের মধ্যে ডুবে গেলেন।

স্ট্যাটিস্টিক্স বলছে এভাবে মানুষ সৃষ্ট অপরিমিত দূষণ চলতে থাকলে আর মাত্র বছর পঞ্চাশের মধ্যে পৃথিবী এক মহা দুর্যোগের সম্মুখীন হতে পারে। চরম গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ফলস্বরূপ বায়ুমন্ডলের গড় তাপমান দু থেকে তিন ডিগ্রি বেড়ে যেতে পারে এবং তাতে আর্কটিক বরফের পুরু চাদর গলে জল হয়ে সমুদ্রে মিশে জলতল বেড়ে যেতে পারে, সমুদ্রের তাপমাত্রার হেরফের হতে পারে, তাতে সমুদ্রে থাকা কার্বন ডাই অক্সাইড বেরিয়ে এসে বায়ুমণ্ডলের তাপমান বিপদজনক ভাবে হেরফের হতে পারে, পৃথিবীর উপকূলবর্তী বহু শহর সমুদ্রের তলায় চলে যাবে, ভূমিক্ষয়, সাইক্লোন, এসিড রেইন, কোনো কোনো অঞ্চলে খরা, কোনো অঞ্চলে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, সমুদ্র স্রোতের দিক পরিবর্তন, জলতল স্ফীতি থেকে সমস্ত ইকোলজিক্যাল ব্যালান্স বিপর্যস্ত হয়ে পৃথিবীতে দুর্ভিক্ষ, মহামারী, হতে পারে । বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইড, মনো অক্সাইড, মিথেন আরো নানারকম বিষাক্ত গ্যাস বেড়ে আমাদের সাধের সভ্যতাকে কয়েক দশকের মধ্যে খতম করে দিতে পারে।
দেশে দেশে বৈজ্ঞানিকরা, পরিবেশবিদরা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে গেল গেল রব তুলেছেন। কিন্তু কে কার কথা শোনে। তথাকথিত দেশ নায়ক, রাষ্ট্রনায়করা, বড় বড় বিজনেস কংগ্লোমারেটগুলো নিজেদের সংকীর্ণ সাময়িক স্বার্থে অন্ধ, লোভে বধির হয়ে ক্রমাগত বিষিয়ে তুলছে পৃথিবীকে, জল, জমি বাতাসকে। সুইডিশ পার্লামেন্টের বাইরে ধর্ণা দেওয়া একটা বাচ্চা মেয়ে যে কথা বোঝে, এতগুলো পাকামাথা বুড়ো ধাড়ি সে কথা বুঝেও বোঝেনা। হায় কবি, ঠিকই চিনেছিলে এদের, "দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর, লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর, হে নবসভ্যতা ! হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী !"
আর্টিকেলের শেষে কমেন্টসগুলো পড়ছিলেন, দেশে বিদেশে অনেকে নিজের মতামত জানিয়েছে, কেউ ভদ্রভাবে, কেউ চাঁচাছোলা ভাষায়, কেউ বা উগ্র বিদ্রুপে ঘৃণা উগরে দিয়েছে সেই সব মাথামোটা অপরিণামদর্শী বালখিল্য অপরিণত মস্তিস্ক রাষ্ট্রনায়ক আর মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর ওপর। হঠাৎ একটা কমেন্টে এসে চোখ আটকে গেলো। এ কয় কি ! সাজিয়ে গুছিয়ে যা লিখেছে তার মর্মার্থ এই যে এই সুন্দর পৃথিবীটা কারো বাপের সম্পত্তি নয় যে তারা সেটাকে ইচ্ছে মতো নোংরা করবে, জঞ্জালে ভরবে, আর তার ফল ভুগতে হবে সমস্ত প্রানিকুলকে, সেই অপোগন্ড মূর্খদের ভণ্ডামি আর বোকামির মূল্য চোকাতে হবে আগামী প্রজন্মের মানুষ আর তাবৎ জীবজগৎকে প্রাণ দিয়ে ! যথেষ্ট হয়েছে আবেদন নিবেদন আর কাকুতি মিনতি, এবার এই মাথামোটাদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণার সময় হয়েছে ! না, সে যুদ্ধ কোনো রকম হিংসাশ্রয়ী সশস্ত্র, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ নয়, কারণ তা কেবল এই ধ্বংস যজ্ঞে আরো ইন্ধন জোগানো হবে। সে যুদ্ধ অন্য রকম যুদ্ধ ! অত্যন্ত সিস্টেমেটিক ভাবে, ধাপে ধাপে কমেন্টকারী তার যুদ্ধের সব স্টেপগুলো বর্ণনা করেছে।

তার মতে, অনেক পন্থার মধ্যে ইন্ডিয়ার দেখানো পথ হলো শ্রেষ্ঠ পথগুলোর একটা। যেমন সত্যাগ্রহ আর অসহযোগ। এখন কমুনিকেশনের যুগ, শহরে গ্রামে নগরে প্রান্তরে আবালবৃদ্ধ বনিতাকে দিকে দিকে জানাও এই বিষময় দূষণের ফল কি হয়েছে এবং অদূর ভবিষ্যতে কি হতে পারে। জনচেতনা জাগ্রত করো। আন্দোলন করো যেন সমস্ত পণ্যে বাধ্যতামূলক ভাবে লেখা থাকে সেটা তৈরি করতে কতখানি বিষ ঢালতে হয়েছে প্রস্তুতকারীকে এবং তাতে কি কি ক্ষতি হয়েছে পরিবেশের। বয়কট করো সে সমস্ত পণ্য আর পণ্য প্রস্তুতকারীকে যারা সেই তথ্য লুকোবে, দেবেনা বা ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে। যেখানে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে, প্রাকৃতিক সম্পদকে নির্বিচারে লুঠ করে মানুষের লোভ তার নিষ্ঠুর রথ চালানোর চেষ্টা করবে, সেখানে তৈরি করো হাজার হাজার, লক্ষ মানুষের মানব শৃঙ্খল।
হাতে হাত ধরে প্রতিজ্ঞা কর, যতক্ষন দেহে একবিন্দু রক্ত থাকবে, জঙ্গল তো দূরস্থান, একটি গাছের প্রাণও আহুতি দেব না, পুকুর, হ্রদ বা নদী বোঁজাতে দেবোনা, নির্বিচারে প্রাণীহত্যা হতে দেব না। উদাহরণ দিয়েছে ইন্ডিয়ান চিপকো আন্দোলনের। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে যদি গাড়োয়ালের তথাকথিত নিরক্ষর আদিবাসী মহিলারা শুধুমাত্র ইচ্ছেশক্তি দিয়ে, স্রেফ মনের জোরে জঙ্গলের গাছগুলিকে জড়িয়ে ধরে গাছ কাটতে না দিয়ে, নিরস্ত্র যুদ্ধে, একফোঁটা রক্তক্ষয় না করে একটা গোটা রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে গিয়ে জয় ছিনিয়ে আনতে পারে, তাহলে, আজ এতো বছর পরে যখন গোটা বিশ্বের কমুনিকেশন ব্যবস্থা এতো উন্নত, দেশে দেশে জনচেতনা এতো জাগ্রত, তখন কি আমরা শুধু এই সব সোশ্যাল সাইটে কমেন্ট লিখেই আমাদের দায়িত্ব সারব ?
কমেন্টের শেষে দিয়েছে তার মেইল আইডি আর যোগাযোগের বন্দোবস্ত। বলেছে বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে প্রাকৃতিক পরিমণ্ডলের ওপর মানুষের পরিকল্পিত ধ্বংসলীলার খবর যেন যতখানি আগে সম্ভব তাদের দেওয়া হয়, তাদের সংস্থা সাধ্যমতো চেষ্টা করবে তা রুখতে। এও বলেছে যে, তাদের বিশ্বাস, জনগণই তাদের শক্তি, তাই তাদের সাংগঠনিক শক্তিকে যেন কেউ খাটো করে না দেখে। কোনো রাজনৈতিক দল বা সংকীর্ণ স্বার্থের বশবর্তী না হয়ে তারা তলে তলে অনেক সংঘবদ্ধ। পৃথিবীর নানা দেশে অসংখ্য সচেতন প্রকৃতিপ্রেমিক তাদের সভ্য। তারা কোনো নিরর্থক শোম্যানশিপে বিশ্বাস করেনা, তাই সভা সমিতি করে প্রচারের চাইতে তারা কাজ করে দেখাতেই বেশি আগ্রহী।
গোটাটা পড়ার পর আলোকরঞ্জনের বিশ্বাস হলোনা এই রকম কোনো সংস্থা আছে বা থাকলেও তারা এই মফস্বলে একটা সামান্য পার্ক বা বটগাছ কাটা বন্ধ করার ব্যাপারে উৎসাহী হবে। কমেন্টবক্সে গিয়ে কমেন্টকারীর নাম দেখলেন, স্যান্ডি , ছেলে বা মেয়ে কিছু বোঝা গেলোনা। তবে দেখলেন লাইকের সংখ্যা ইতিমধ্যে প্রায় হাজার চল্লিশ।

আজ খুব সকালেই ঘুম ভেঙে গেছে আলোকরঞ্জনের ! গদাইয়েরও বয়স হয়েছে, আলোকরঞ্জন ভাবলেন, রাত্রে বেডরুমের পর্দা পুরো টেনে দিতে ভুলে গিয়েছিল, তিনি নিজেও খেয়াল করেন নি। সকালে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে ঘুম গেছে তার। সকালের প্রথম রোদ্দুরে ঘর ধুয়ে যাচ্ছে। এখনো গদাই ওঠেনি, মালতি তো আসবে সেই নটা নাগাদ। আলোকরঞ্জনের চা তেষ্টা পেয়েছে, রান্নাঘরের দিকে চললেন তিনি। চা নিয়ে যখন বারান্দায় বসলেন তখন আওয়াজে গদাই উঠে পড়েছে। ধমক দিয়ে বললো, আলোকরঞ্জন কেন তাকে ডেকে তোলেন নি। আলোকরঞ্জন মৃদু হাসলেন, গদাইয়ের ধমক তিনি আজকাল খুব এনজয় করেন। কেউ একজন তো আছে যার আলোকরঞ্জনের ওপর এতো অধিকার ! গদাই জানে কি করতে হবে এরপর, ঘর থেকে সিগারেট আর লাইটারটা এনে রাখলো টেবিলের ওপর, গজগজ করে বললো, ডাক্তার বলেছে গোটা দিনে পাঁচটার বেশি না, আর আলোকরঞ্জন পঞ্চাশটা সিগারেট টানছেন ! কি ভাবেন তিনি, দেখার কেউ নেই ? তারপর আরো গজগজ করতে করতে বাংলা আর ইংরেজি সংবাদপত্র দুটো সামনের টেবিলে ধপ ধপ করে ফেললো। চশমাটা পাঞ্জাবির কোন দিয়ে একটু পুঁছে নিয়ে বাংলা পেপারটা খুললেন আলোকরঞ্জন, আর খুলেই স্তম্ভিত হয়ে গেলেন।

কি একটা কারণে কলেজ ছুটি হয়ে গেল। আমি সৃজন বৃষ্টি পলাশ আর মেঘ ঠিক করলাম ধর্মতলা যাব মেট্রোতে দারুন একটা সিনেমা এসেছে, সবাই মিলে দেখব। খরচের সিংহভাগের সবটা দেবে সৃজন ও এ ব্যপারে দিলদার। ও এমনটা পারে, বাকি আমরা ঠিক ততটা নয়। এই নিয়ে পলাশ মাঝে মাঝে তর্ক করে। -কেন ও সবটা দেবে নিজেদের খরচ নিজেরায় করব। ওর ঘাড়ে না চরলেই হয়। আমিই বললাম -থাকনা তুই না হয় পরে কোন একদিন দিন খরচ করবি। ট্রাম ছুটে যায় সবুজের বুক চিরে রেসকোর্সের মাঠ পিছনে পড়ে থাকে ছবির মতন। -বৃষ্টি তোর কি মন খুব খারাপ! মুখে যেন কালবৈশাখী ঝড়ের পূর্বাভাষ। -ঠিক বলেছিস আকাশ বাবার শরীর ভীষণ খারাপ দেখে এসেছি, কি জানি বাড়ি গিয়ে কি দেখব। মেঘ চিৎকার করে ফুঁসে ওঠে -কিরে বৃষ্টি তুই সুযোগ পেলেই আকাশের সাথে গুজ গুজ ফুস ফুস করিস কেন? আমিও তো তোর বন্ধু কই আমার সাথে এমন আপন কথা বলিস নাতো? বৃষ্টি মিষ্টি হাসি ফিরিয়ে দেয় -ও আমার অসুস্থ বাবার খবর নিচ্ছিল কেন তোর কি হিংসা হচ্ছে। সৃজন বজ্রের মতন সব থামিয়ে গর্জে ওঠে -তোরা এবার চুপ কর, দোহায় ঠাম! আমরা গন্তব্যস্থলে পৌঁছে গেছি।
ট্রাম থেকে নামতেই আকাশ ভাঙা বৃষ্টি নেমে এল অঝোরধারায়। ভিজে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই। কারোর কাছে ছাতা ছিলনা অগত্যা আমরা ইচ্ছা করেই বৃষ্টির কাছে আত্ম সমর্পণ করলাম। চুপচাপ থাকা পলাশ উচ্ছাসে আনন্দ প্রকাশ করে -আয় বন্ধুরা আয়, এবার সবাই মিলে এই বৃষ্টিতে অসভ্যের মত ভিজব। সিনেমা দেখব অন্য আর এক দিন। হাতে হাতে রাখ আর গলায় গলায় গান গেয়ে চল ''আমরা সবাই রাজা আমাদেরই রাজার রাজত্বে''। ছবির মতন একটা দিন বৃষ্টি এলেই আমার চোখে ভাসে।

আজ সন্দীপনের গল্পের শেষ পর্ব বাকি থাকুক, আজ আরেক নতুন গল্প : গল্পের নাম বটবৃক্ষ, গল্প ভাল লাগলে পরের পর্বগুলো দেওয়া যাবে !

(এ বড় সংকীর্ণ কাল
বিষের বিষম জাল
- নির্বাক হিসেবে চায়
শ্মশান-চণ্ডাল -
হিংসা হিংস ধর্মাধর্ম
বোকা এই সিংহ চর্ম
লোভে পাপে গড়া বর্ম
লালসার ঢাল
পুড়ে যায় জ্বলে যায়
আদমের পুত্র হায়
আবেলের রক্তে ভেজা
প্রত্যেক সকাল !)

পর্ব এক

আলোকরঞ্জন পার্কের ধারের দিকে ধীরে ধীরে গাছটার প্রকান্ড গুঁড়িটার পাশে এসে দাঁড়ালেন। আস্তে আস্তে বটগাছটার মোটা কান্ডটার গায়ে পরমসুহৃদের মতো স্নেহভরে হাত রাখলেন। ফেব্রয়ারির দুপুর বেশিক্ষন থাকেনা, বিকেল তো আরো কম। দিনটা মেঘলা ছিল, পশ্চিমের আকাশে একটা বিষণ্ণ গেরুয়া ঘেঁষা আলো, যেন বৃদ্ধ সূর্যদেব গৈরিক বসন গায়ে জড়িয়ে নিয়ে সন্ধ্যাহ্নিকে বসার আয়োজন করছেন। এই সময়ে বিকেলের দিকে কেমন একটা মন খারাপ করা হাওয়া দেয়। ঠান্ডা বা গরম নয়, কিন্তু হাওয়ায় একটা অদ্ভুত নিরাসক্তি খেলা করে। যেন কানে কানে বলে যায়, এই জগতের কিছুই স্থায়ী নয়, সব কিছু অনিত্য, সবের শেষ আছে, সব্বাইকে সব কিছু ছেড়ে একদিন যেতে হবে। সকলে এখানে দুদিনের অতিথি মাত্র। বিশাল বটগাছটা ওই মৃদু হাওয়াতেই সর সর শব্দ করে উঠলো, আলোকরঞ্জনের মনে হলো গাছটা যেন কথা বলে উঠলো। খুব চেনা স্বর, কত বছর ধরে শুনছেন যে এই বটবৃক্ষের আলাপ। সকাল, দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যে আর রাত্রিতে, গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্তে, শীত বসন্তে, সুখে, দুঃখে, মৌন, মুখরে ! কথাগুলো ধরি ধরি করে ধরতে পারছেন না আলোকরঞ্জন ! উৎকর্ণ হয়ে ভালো করে শোনার চেষ্টা করলেন, যেন একটু কান করে শুনলেই বোঝা যাবে। কিছু তো বলছেই। বোধ হয় বুঝতে পেরেছে যে সভ্যতার এই চতুর্থ সন্তান, ঈশ্বরের সৃষ্টির সবচেয়ে বড় ভুল, এই মানুষ নামের অর্বাচীন দুর্বিনীত অকৃতজ্ঞ জীব তার নিজস্ব আদালতে একতরফা ডিক্রী জারি করেছে তার জীবনের ওপর, বিনা দোষে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে এই বিশাল বয়োবৃদ্ধ ভীষ্ম পিতামহকে। মনে হলো, শেষের সে দিন সমাগত জেনে তবুও এই বটবৃক্ষ তার নিজস্ব ভাষায় অস্তগামী সূর্য্যদেবকে দিনের শেষ প্রণতি জানাল, তার সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে জগতের মঙ্গল কামনা করলো।
গাছটার গায়ে আবার হাত বোলালেন আলোকরঞ্জন, মাথা নুইয়ে বিড়বিড় করলেন, "হ্যাঁ, তুমি ঠিকই শুনেছ, আজ সকালেই মিউনিসিপ্যালিটির ডিসিশন হয়ে গেছে, তোমার মৃত্যু পরোয়ানা জারি হয়েছে, প্রকৃতির দেওয়া তোমার অধিকারকে পায়ের তলায় মাড়িয়ে তোমার মৃত্যুভূমির ওপর দিয়েই ছুটবে মানুষের সভ্যতার রথ, নিজস্ব স্বার্থের ঘূর্ণ্যমান চাকাগুলো, তৈরি হবে সিক্স লেন হাইওয়ে। আরও পণ্য, আরও উপচার, আরও লাভ, আরও টাকা, আরও আরাম, আরও ভোগ, আরও, আরও অশান্তি, আরও পাপ, উন্নতির ছদ্মবেশে চোখে কাপড় বেঁধে সীমাহীন লালসাময় অন্ধকারের দিকে আরও জোরে ছুটে চলা।"
একটা বড় দীর্ঘ্যনিশ্বাস বেরিয়ে এলো আলোকরঞ্জনের বুক থেকে। অশক্ত পায়ে অত্যন্ত ধীরে গাছটার কাছ থেকে দূরে সরে এলেন আলোকরঞ্জন। আকাশের আলো তখন প্রায় নিবে এসেছে। পকেটে হাত ভরে সিগারেটের প্যাকেটটা নিতে গিয়ে হাতে ঠেকলো মোবাইলটা। তখনি মনে পড়লো তার অবস্থাও এই বটবৃক্ষের মতোই। দুই ছেলেই আসছে, একজন আমেরিকা আর একজন ব্যাঙ্গালোর থেকে। বোধ হয় বুঝেছে যে আলোকরঞ্জনের দিন ফুরিয়ে এসেছে। সময় থাকতে থাকতে এতো বড় পৈতৃক বাড়িটার সদ্গতি করে ফেলতে হবে। সদ্গতি ! হুঁ, সদ্গতিই তো। কেন যে আজ সকালেই মর্নিং ওয়াক করার সময় বিনয় পোদ্দার রাস্তায় যেন দৈবাৎ দেখা হওয়ার ভান করে গায়ে পড়ে "কেমন আছেন প্রফেসর সাহাব" বলে, সেটা বুঝতে পঁচাত্তরের রিটায়ার্ড ম্যাথমেটিক্স প্রফেসর আলোকরঞ্জনের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। প্রোমোটার বিনয় পোদ্দার প্রথম তার লোভের ঝোলা নিয়ে এসেছিলো প্রায় বছর খানেক আগে। তিনি তাকে তখন পত্রপাঠ ভাগিয়ে দিয়েছিলেন। ছেলেদের ফোন নম্বর জোগাড় করা, ও সব প্রোমোটারদের বাঁ হাতের খেল। তারপর তিনি কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার সময় তো চিকিৎসার সুবিধার্থে অনেককেই ছেলেদের ফোন নাম্বার দিয়েছিলেন।
ইদানিং মাস দুয়েক আগে পোদ্দার প্রোমোটার আবার এসেছিল একটা ষণ্ডা মতো চ্যালা নিয়ে সকালের দিকে। বাড়ি বয়ে, ঘন্টাখানেক ধরে অমার্জিত বাংলা, হিন্দি আর অশিক্ষিত ইংলিশের জগাখিচুড়িতে বুঝিয়েছিল তার "পেলানটা কি আছে !" লোকটা অলমোস্ট ধরেই নিয়েছে যে বাড়িটা জমি সমেত আলোকরঞ্জন দিয়ে দিচ্ছেন। একতরফা ভাবেই বকে যাচ্ছিলো, বোঝাচ্ছিলো তার বাড়িটা নেওয়া কেন তার কাছে এতো ইম্পরট্যান্ট ! এতো দুঃখের মধ্যেও আলোকরঞ্জনের হাসি পেলো, ওই সাত সকালে মুখের মধ্যে রেডিমেড পান গুটখা ভরে, অশিক্ষিত পোদ্দারের মুখে হিন্দির অনুকরণে অশুদ্ধ বাংলায় "ইম্পরট্যান্ট" শব্দটা কি হাস্যকর শোনাচ্ছিল। পান গুটখার গন্ধ, আর থুথু ছেটাতে ছেটাতে এক কথা পঁচিশবার রিপিট করে বুঝিয়েছিল তার বাড়ির লোকেশনাল অ্যাডভান্টেজ। পার্কের কান ঘেঁষে তার বাড়ির যা অবস্থান তা একেবারে যাকে বলে মনিকাঞ্চন যোগ। সরকারি খাতায় হাইওয়ের প্ল্যান পাকা হয়ে গেছে, সেটা যাবে পার্কের পাশ ঘেঁষে, বটগাছটা যেখানে আছে, সেখানে হবে শহরের একটা প্রধান স্টপেজ আর তার এই চোদ্দ কাঠার বিশাল জায়গাটা আর আশপাশের আরো চার পাঁচটা বাড়ি নিয়ে সে বানাবে শপিং মল কাম রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্স। সে কমপ্লেক্সের খসড়া প্ল্যান অবধি কলকাতার কোন বড় আর্কিটেক্ট সংস্থাকে দিয়ে বানানো হয়ে গেছে। আশপাশের বাড়িগুলোর সাথে কথা হয়ে গেছে, সে নিয়ে কোনো চিন্তা নেই, এখন খালি তিনি অনুমতি দিলেই সে নাকি আগে বাড়তে পারে। ভাবলেন আলোকরঞ্জন, কি আস্পর্ধা লোকটার ! আর ভাবলেন, পয়সার লোভে লোকটাকে কতখানি অন্ধ করে তুলেছে ! পোদ্দার ভেবেই নিয়েছে যে পয়সায় সব হয়, ধরে বসে আছে যে আলোকরঞ্জন না করতেই পারেন না। পঁচাত্তরের বিপত্নীক বৃদ্ধ রিটায়ার্ড শিক্ষক, কাছে বলতে কেউ নেই, ছেলেরা সব বাইরে, ভরসা বলতে দুটো কাজের লোক, সে আবার না করবে কি ? সাথে সাথে আলোকরঞ্জন ভাবলেন, যে পোদ্দার যদি এরকম ভেবেই থাকে, তাহলে এই ভাবনার মধ্যে এতটুকুও ভুল নেই, সত্যিই তো তার জন্য দুটো কথা বলার কে আছে ! পুরোটাই পরভরসা তার। চারিদিকে চেয়ে তার নিজেকে বড় একা মনে হলো। যেদিন থেকে এই ব্যাপারটা তার গোচরে এসেছে, একটা অস্বাস্থকর অস্বস্তি তাকে মনে মনে কুরে কুরে খাচ্ছে সেটা তিনি বুঝতে পারছেন। সবচেয়ে নিরাশা ব্যাঞ্জক ব্যাপারটা হলো যে তার নিজের ছেলেরা যে দিন থেকে এটা শুনেছে, তারা যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। তাদের জন্যে, এ যেন একটা খুব বড় সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে । তিনি বুঝেছেন যে ছেলেরা ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে উঠেছিল যে বাপের এতো বড় বাড়ি, লাগোয়া ছ কাঠার বাগান, এই বিশাল সম্পত্তির কি বন্দ্যোবস্ত হবে, বিশেষত তার অবর্তমানে কে এসবের দেখভাল করবে ! এ যেন তাদের কাছে সব সমস্যার একেবারে হাতে গরম সল্যুশন, মেঘ না চাইতেই জল। তিনি জানেন ছেলেরা তার মৃত্যুকামনা করেনা মোটেই, লোভীও নয়, কিন্তু তাদের সংসার, ক্যারিয়ার ফেলে তাদের পক্ষে এই সম্পত্তি রক্ষা করা কোনো ভাবেই সম্ভব নয়, সোজা কথায় প্রাকটিক্যাল নয় একেবারেই। তার মনে পড়ল, ব্যাপারটা শুনে ফোনের উল্টো দিকে আকাশরঞ্জন, মানে তার বড়ছেলে জিজ্ঞেস করেছিল, কতদিন নাগাদ ব্যাপারটা বাস্তবায়িত হবে বলে তিনি মনে করেন !
এই সময়ে অন্নপূর্ণার অভাবটা তিনি খুব বেশি বোধ করেন। সে ছেড়ে চলে গেছে বছর দশেক। ভরা সংসার সাজিয়ে দিয়ে গেছে। দুই কৃতি ছেলে, ছেলের বৌ, নাতি নাতনির মুখ দেখে সে গেছে। নিজেকে অকাতরে বিলিয়ে, সবাইকে সুখী করে, বিনা নোটিসে একদিন হঠাৎ সে চলে গেলো অমৃতলোকে। পেছনে রেখে গেছে আলোকরঞ্জনকে, আর রেখে গেছে বাড়ির কোনায় কোনায়, পরিবারের প্রতিটি সদস্যের হৃদয়ে তার অনিবার্য্য উপস্থিতি। আত্মীয় অনাত্মীয় নির্বিশেষে সবাই তার অনিবার স্নেহ মমতা পেয়েছে। দুঃখের হলেও অন্নপূর্ণার স্মৃতি নিয়ে খেলা করা আলোকরঞ্জনের এক খুব বড় মনের আরামের জায়গা। প্রকৃতি ভালবাসতেন দুজনেই। বাড়ির লাগোয়া পার্কটা তখন হয়নি, জায়গাটা জলা জঙ্গল ছিল ! মনে পড়লো, বিয়ের পরে পরে নতুন বৌকে নিয়ে একদিন দুপুরে ঘুরতে ঘুরতে এই বটগাছটার কাছে এসেছিলেন। সময়টা বোধহয় মার্চের শেষ বা এপ্রিলের প্রথম দিক, সবে বসন্তের হালকা হাওয়া দিতে আরম্ভ করেছে। আলোকরঞ্জন সাধারণত সংযত প্রকৃতির, কিন্তু সেদিন সেই চৈত্রের দুপুরে হাওয়ায় কি যেন ছিল। বাচ্চা মেয়ের মত একটা জল-ফড়িঙের পিছনে ছুটে অন্নপূর্ণা হাসতে হাসতে বটগাছটার নিচে বসে পড়েছিল। দুটো কোকিল জগৎ ভুলে কুহুকুহু করে মান অভিমানের পালাগান গাইছিলো। কাছাকাছি জনপ্রাণী ছিল না। আলোকরঞ্জন আর সেদিন নিজেকে স্থির রাখতে পারেন নি। অন্নপূর্ণাও ! বাড়িতে বাবা মা, পিসি আর পিসির ছেলেপিলে আর ঠাকুর চাকর ভরা সংসারে অন্নপূর্ণাকে পেতেন খালি রাতে, চার দেয়ালের মধ্যে। উন্মুক্ত প্রকৃতির মাঝে এভাবে প্রিয়তমাকে পাওয়ার সে কি অনন্যসাধারণ অনুভূতি, আজন্ম ভোলার নয়। আলোকরঞ্জনের মনে হয়েছিল গোটা আকাশ যেন তার বিশাল চোখ মেলে এই দুটি তরুণ তরুণীর মিলন প্রত্যক্ষ করেছিল, পরমা প্রকৃতি যেন একসাথে তাদের আদর সোহাগ ভাগ করে নিয়েছিল ! লজ্জায় রাঙা হয়েও খুশিতে, আনন্দে ডগমগ করছিলো নতুন বৌ অন্নপূর্ণা। আঙ্গুল তুলে হঠাৎ বলেছিল, "এ মা, সব যে দেখে নিল একজন, যদি কাউকে বলে দেয় ?"
আলোকরঞ্জন ভুরু কুঁচকে জিগেস করেছিলেন, "কে একজন ?"
অন্নপূর্ণা আলোকরঞ্জনের বুকে মুখ রেখে চোখ বুঁজে আদরে ডুবে গিয়ে বলেছিলো, "ওই যে ওপরে হাজার চোখ মেলে দেখছে, বুড়ো বটগাছ !"
আলোকরঞ্জন হেসে বলেছিলেন, "ওহ, পিতামহ ? তিনি কাউকে বলবেন না, দেখছো না, নাতি নাতবৌয়ের প্রেমলীলা দেখে কত খুশি ? ফিসফিস করে আশীর্বাদ করছেন !"
সেই প্রথম আলোকরঞ্জন এই বুড়ো বটবৃক্ষকে পিতামহ সম্বোধন করেছিলেন। পরে কখনো কোনো লোকেশন বা ডাইরেকশন দিতে গিয়ে, রেফারেন্স দিতে দিতে আস্তে আস্তে বটবৃক্ষর সেই “পিতামহ” নাম তার পরিবারের মধ্যে চালু হয়ে যায়, এবং তারপর কি করে যেন লোকমুখে এই তল্লাট জুড়ে। সম্ভবত বেশ কয়েক বছর পরে অধ্যাপক হিসেবে রাষ্ট্রপতি সম্মান পাওয়ার পর এই পার্কটার উদ্বোধনের সময়ে এক লোকাল ক্লাবের ফাংশনে তাকে প্রধান অতিথি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, আর সেখানে তিনি এই বটগাছের কথা বলতে গিয়ে এই পিতামহ নামটা সর্বসমক্ষে বলেছিলেন। আপামর জনসাধারণের খুবই পছন্দ হয়েছিল নামটা। একটা দুঃখের সাথে সুখের স্মৃতির নিশ্বাস বেরিয়ে এলো আলোকরঞ্জনের।
শেলীর একটা কবিতার কয়েকটি লাইন মনে পড়ল, বিড়বিড় করলেন নিজের মনে, "উই লুক বিফোর এন্ড আফটার, এন্ড পাইন ফর হোয়াট ইজ নট, আওয়ার সুইটেস্ট সাংস আর দোজ, দ্যাট টেল আস স্যাডেস্ট থটস !" সত্যি কি, সমস্ত সুখস্মৃতির মধ্যেই একটা না পাওয়ার, অতৃপ্তির যাতনা লুকিয়ে থাকে ? কে জানে ! সেই প্রায় বালিকা অন্নপূর্ণাকে সেভাবে আর কোনোদিনই পাননি আলোকরঞ্জন, বৃহৎ সংসারের বৃহৎ দায়িত্ব, তার কর্মজালে জড়িয়ে খুব দ্রুত অন্নপূর্ণা গৃহিনী হয়ে উঠেছিল, আর আলোকরঞ্জনকে হতে হয়েছিল বৃহৎ সংসারের মূল কান্ড। পরে বহুবার ভেবেছেন আর একবার যদি অন্নপূর্ণাকে নিয়ে সেভাবে---, নাহ, তার সাহসে কুলোয় নি।
বাড়ি এসে পৌঁছতে পৌঁছতে খেয়াল হলো, সিগারেটটা ধরানো হয় নি। ভালোই হলো, চা খেয়ে তারপর তারপর ধরাবেন ‘খনে। অন্নপূর্ণা থাকতে সে বারণ করতো, যদিও খুব একটা কড়া ভাবে নয়, একটা হালকা অনুযোগ, একটু প্রশ্রয় মিশে থাকতো তাতে। মাঝে মাঝে আলোকরঞ্জন ভাবতেন, অন্নপূর্ণা তার সিগারেট খাওয়াটা ততখানি অপছন্দ করতো না বোধহয়। অনেক সময় সন্ধ্যেয় চা খেয়ে দীর্ঘ্যক্ষন সিগারেট না খেলে একটু ফিক করে অন্নপূর্ণাকে হেসে বলতে শুনেছেন তিনি, "কি হলো, আজ সিগারেট ধরালে যে না বড় ? এতো ভালো ছেলে কবে থেকে হলে ?" মোবাইলটা আর প্যাকেটটা বার করে টেবিলে রেখে হাঁক পারলেন, "গদাই, চা টা এবার দে।"
ছেলেদের প্রস্তাব ভাবতে বসলেন আলোকরঞ্জন। দুজনেই তাকে নিয়ে যেতে চায়। এখনও জোরাজোরি কিছু করেনি সেভাবে, কিন্তু দুজনেই তাকে ঠারেঠোরে শুনিয়েছে যে এভাবে একা একা এখানে পড়ে থাকার কোনো মানে হয় না। এবারে তিনি যেভাবে চান, দুই ছেলের মধ্যে যার সাথে থাকতে চান, তার কাছে গিয়ে থাকাটাই শ্রেয়। কথাটা খুব একটা অযৌক্তিক নয়। বাস্তবিক দিক থেকে দেখলে এর চেয়ে ভালো আর কিছু আর হতে পারেনা। কোন ভরসায় তিনি এখানে থাকবেন ? বুড়ো গদাই আর মালতি, মানে দুটো কাজের লোকের ভরসায়? এদের সততা আর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই, কিন্তু বিপদে আপদে এদের কতখানি সাপোর্ট দেওয়ার ক্ষমতা আছে ? বাড়িটার কি হবে সে কথা জিজ্ঞেস করতে ছেলেরা দুজনেই একটা ভাষা ভাষা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছে, "সে চিন্তা ভাবনা করে দেখা যাবে পরে" গোছের।
তিনি কিছুক্ষন বসে রইলেন স্থানু হয়ে, তারপর রিমোটটা নিয়ে টিভিটা চালিয়ে দিলেন, আপাতত ব্যাপারটা ভুলে থাকার জন্যেই হোক বা সেরকম কিছু করার নেই বলে। একটা বাংলা চ্যানেলে সিনেমা দেখাচ্ছে। নায়ক নায়িকা নেচে নেচে রাস্তায় প্রেম করে বেড়াচ্ছে, সাথে গুচ্ছের ছেলেপিলে নাচছে। কী যে ভাবে এই পরিচালকগুলো ! কি সব গুলে খাওয়াচ্ছে পাবলিককে। মনে পড়লো, একবার ইউরোপের একটা দেশে আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলেন তিনি, সেখানে কফি ব্রেকে একজন রিসার্চ স্কলার, ডেলিগেটদের মধ্যে এক স্বল্প পরিচিতা বিদেশিনী তরুণী তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ভারতবর্ষে ছেলে মেয়েরা এভাবে প্রেম করে বেড়ায় কিনা, মানে ভালোবাসা হলে রাস্তায় বিস্তর সঙ্গীসাথী নিয়ে নেচে নেচে প্রেম করে কিনা। উত্তর দিতে গিয়ে হেসে ফেলেছিলেন আলোকরঞ্জন। জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমেরিকান ফিল্মগুলোয় যে দেখায় হিরো আর ভিলেনরা কথায় কথায় দেদার গুলি চালিয়ে মুড়িমুড়কির মতো মানুষ মারে বা ইয়ং ছেলে মেয়েরা একদিনের দেখাতেই ডিনারে গিয়ে বিছানা শেয়ার করে সেগুলোকেও সে সত্যি ভাবে কিনা। তরুণী অত্যন্ত ভদ্রভাবে নিজের ভুল স্বীকার করেছিল সত্যি, কিন্তু আলোকরঞ্জন অস্বীকার করতে পারেননি যে এই সমস্ত সিনেমাগুলো কি সব অবাস্তব জিনিস দেখিয়ে বহির্বিশ্বে ভারতবর্ষের সম্মন্ধে অত্যন্ত ভুল ছবি তুলে ধরছে। হয় কবেকার কি সব প্রাচীন কুপ্রথাকে নতুন করে আবিষ্কার করে, তাই নিয়ে সিনেমা বানিয়ে বাইরে তুলে ধরে, আর তা নয় ভারতবর্ষের দারিদ্রকে মূলধন করে সিনেমা বানিয়ে, এখনকার অধিকাংশ পরিচালক স্বস্তায়, অল্প পরিশ্রমে নাম কিনছে। কুপ্রথা, দারিদ্র কোথায়, কোন দেশে নেই ? বাইরের চাকচিক্যটুকু তুলে দিলে মানুষ এখনো সেই স্বার্থান্ধ পশুবৃত্তির খুব একটা ওপরে উঠতে পারেনি। ইদানিং সব কিছুর বাণিজ্যায়ন হয়ে সমস্ত মানবজাতি খুব দ্রুত কি এক অনির্দেশ্য ভবিষ্যতের দিকে অন্ধবেগে ছুটে চলেছে ভাবলেও ভয় করে। আলোকরঞ্জন চিন্তা করলেন। সব কিছুর মধ্যে লাভের অঙ্ক দেখতে গিয়ে মানব জাতির ব্যালান্সসিটে লোকসানের দিকটা কি অসম্ভব ভারী হয়ে উঠেছে ! হেলথ-ড্রিঙ্ক কোম্পানি ঠিক করে দেবে কার ছেলেমেয়ে স্কুলে ফার্স্ট হবে, দাঁতের মাজনের কোম্পানি ঠিক করে দেবে ছেলেটার প্রেম নিবেদন সফল হবে কিনা, বাইকের কোম্পানি আর শ্যাম্পুর বোতল ঠিক করে দেবে কোন ছেলেটি কোন মেয়েটিকে পেছনে চাপিয়ে বাকি সবার ইর্ষাকাতর দৃষ্টির সামনে দিয়ে ধাঁ হয়ে যাবে ! কন্ডোম কোম্পানি ঠিক করে দেবে নরনারীর মিলন সফল হবে কিনা ! হায়রে বাণিজ্যায়ন ! পিতামহ শরশয্যায় যাবেন, না যান্ত্রিক করাতে ধরাশায়ী হবেন আর সেটা কবে, ঠিক করে দেবে ওই পোদ্দারের মতো "ইম্পোটেন্ট" গুটখাখোর জোকার !
(ক্রমশঃ )

"ফুটবল বিশ্বকাপ
বনাম চায়ের কাপ"

আসছে আবার বিশ্বকাপ
বাজছে ঢাকের তান,
পাড়ায় পাড়ায় শুরু হবে
ফুটবল-উৎসবের গান।

ঘরে ঘরে চলবে তখন
ফুটবলেরই জ্বর,
চায়ের কাপে মুড়ি-চপে
বইবে তুমুল ঝড়।

শিঙাড়া আর পেঁয়াজু
জমবে প্লেটের পর প্লেটে,
গোল না হলে রাতটা কি
আর সহজে যাবে কেটে?

বইয়ের পাতা খোলা তবু
পড়া হবে না মোটে,
মেসি-নেইমার তর্ক চলবে
খাতার পাতার নোটে।

ছাদে উড়বে হরেক রকম
পতাকা প্রিয় দলের জন্য,
খেলোয়াড়দের পায়ের
জাদু করবে বিশ্ব ধন্য!

কাজকর্ম শিকেয় তুলে
মানুষ খেলায় দেবে মন,
প্রিয় দলের জয় দেখতে
রইবে ব্যাকুল সারাক্ষণ!

বাবা ডাক শুনলেই বুকটা কেঁপে ওঠে এখন। কতদিন তোমায় বাবা বলে ডাক দিইনি। কোন এক বাবা প্রায় ঘুমন্ত ছেলেকে সাইকেলে করে স্কুলে নিয়ে যায়, দেখে মায়া হয়। তুমি কখনো তেমন করনি। প্রথম ভর্তির দিন শুধু নিয়ে গিয়েছিলে স্কুলে। তারপর ফিরেও দেখনি হয়তো আজীবন আমাদের ভালো হবে ভেবে। সত্যি কথা বলতে তোমার পক্ষে সম্ভবও ছিলনা। গ্রাম থেকে শহরে আসা এক যুবক নানান সংসার যুদ্ধে তুমিও খুব নাকাল। বুঝতাম তবু তীক্ষ্ণ নজর ছিল আমাদের গতিবিধির উপর। ভরসা ছিল আমরা যেন লতানো গাছ না হয়ে উঠি বৃক্ষসম, যেন ঝড় বৃষ্টি রোদ্দুরের সাথে মোকাবিলা করতে শিখি। ভাবতে অবাক লাগে এক কুঠুরি ঘর তোমার অনুশাসনে হয়ে যেত পাঠশালা গানঘর, শয়নঘর আহার বিহার সব সব। তাইতো গুটিপোকা থেকে প্রজাপতি হয়ে উড়তে পেরেছি। এখন ভাবলে আশ্চর্য লাগে এমন করে আমি কি পারলাম? আমিও বাবা হয়েছি জানিনা তোমার মত পারছি কিনা।
মাথার উপর ছাদ তুমিই ছিলে। নীল সমুদ্র আকাশ পাহাড় রাস্তা ঘাট সব কিছু অবলীলাক্রমে দায়িত্ববান পথ প্রদর্শকের মতো চিনিয়ে দিয়েছ। সব বলে শেষ করা যাবেনা। যেদিন চলে গেলে ভেবেছিলাম অগাধ জলে ডুবে যাচ্ছি... তখনি তোমার মুখ ভেসে ওঠে মুখের সামনে -ভয় কি আমি তো আছি থাকব । সাদাকালো ছবির ভিতর থেকে জেগে উঠে বলে যাব কাঁটাতার পেড়িয়ে যাবার মন্তর। ভয় কে জয় করে এগিয়ে যাও ছায়া বিস্তার করে যাও আজীবন।

সাদা ঘরে সাদা ছায়া
ঘোরাফেরা করে।
ছিটকিনি বেপাত্তা
দরজার ফাঁদে।
বেডসাইড টেবিলেতে
হাতঘড়ি, ক্যাপসুল,
ঘুমের মাসুল গোনে
রাতজাগা পাখি অবসাদে।

শেষ রাতে রামধনু ওঠে।
কোনো এক গোলার্ধে
ভরে যায় আলো।
কোনো এক নদী অস্ফুটে
বালিতে বিলীন হয়।
বিবর্ণ হয় মাছধরা জালও।

সুহাসিনী, তুমি ভালো থেকো
এই অস্থির পৃথিবীতে।
তুমি যাদের ভালোবাসো
তারাও যেন সব থাকে তৃপ্তিতে।

তোমরাও কি গিয়েছিলে কাল?
ভেসেছিলে মোহনায়?
তোমাদেরও কি কেটেছিল দিন
পরিত্যক্ত প্রার্থনায়?

তোমরাও কি যযাতির জাতি?
অক্ষয়যৌবনকামী?
তুমিও কি কাঁদো বাথরুমে?
তুমিও কি আসলেতে আমি?

না না,
সুহাসিনী, তুমি আনন্দে থেকো
এই বিপন্ন অসুখের কালে।
মরুদ্যানের ছায়ার আবির
লেগে থাক ওই দুই গালে।

সারি গান একঘেয়ে,
গুঞ্জন গর্জন হয়।
হাতফোন ঘষে ঘষে
চাহিদার বন্যায় বাঁধ।
বিছানার চোরাবালি
তল নেই,
সিপাহসালার খোঁজে
কাঁদবার মতো কোনো কাঁধ।

টবে টবে মড়া গাছে
জল ঢালি রোজ।
দেরি করে জন্মানো,
ভরে যাই রোজ লেট ফাইন।
সুহাসিনী, তুমি আল্হাদে থেকো।
লোকগীতি হয়ে যাক
আমাদের পরিচয়,
একজোড়া রেলগাড়ি লাইন।

সে কখন বসে থাকে
কলজের পাশে এসে প্রতীক্ষায়,
অহেতুক -
ভালবাসা চেয়ে
শুধু চেয়ে চেয়ে -
মূক
মায়াবী চোখের এক অদ্ভুত
অনাহত দৃষ্টিসুখ
দিয়ে অভিসরিকার মত তার উন্মুখ চিবুক,
এই আহত জীবন থেকে খুঁজে নেয় সুখের অসুখ
থেকে
হেম হেম প্রেমকুন্ডে অসীম কুম্ভকে ডুব দিয়ে
অমর্ত্যের মন্থনে আলো আনে
আনে প্রেম, আনে ভালবাসা
দিয়ে গড়া অদ্ভুত অমর্ত্য আশা
এই বিবর্ণ যাওয়া আসা
অর্থহীন হয়
পড়ে থাকে বিনম্র পায়ের কাছে
যত যত অনুযোগ আর
বিশুস্ক কঠিন হাওয়া
জয় পরাজয়
আমার এ গণ্ডি ভেঙে
বিপুল ভুবন বিপুল বিস্ময়
আর কথকতা
নিরর্থক শব্দ সব ভোলে
সব অপচয় যত বিপন্ন বারতা -

বিপুল এ অর্থহীন সৃষ্টির কেন্দ্রজুড়ে
যেন সেই একমাত্র সত্য
সে একটিই সুখ -
প্রেম ছুঁয়ে, গহীণের গহন চোখে নিয়ে
সে কখন বসে থাকে
কলজের পাশে প্রতীক্ষায়
অহেতুক

আমি তো আমার যত রিক্ত বৈভব
দিকভ্রান্ত চাওয়া আর মগ্ন ছেলেখেলা -
কিছু ভ্রান্ত অনুভব
নিয়ে
একান্ত নিজের মতো অন্যায্য সাধক
ভুল এই অবহেলা
আর ভালোবাসা বিষ
ক্লান্ত অহর্নিশ
অনলে অনল পিয়ে
সুখ চেয়ে, চেয়ে চেয়ে
শুধু চেয়ে
আর ব্যর্থ দশদিশ
জীবন নামের এক ক্লান্ত বাহক
তবুও তো দিনশেষে
সে আসে, মৃদু হেসে
কখন অমৃতযোগে,
কোন এক অমৃতকুম্ভ
ভরে ওঠে মগ্ন এক ঋদ্ধ অনুরাগে
সে কোন অনর্থের নিবিড় বাঁধনে
শুধু ভালোবেসে
বিপুল এ অর্থহীন সৃষ্টির
অবারিত অমোঘ সে অর্থ বয়ে আনে
ভালোবাসা চেয়ে
চেয়ে চেয়ে, শুধু চেয়ে
যেন সেই এই সৃষ্টির একমাত্র সুখ

সে কখন বসে থাকে
কলজের পাশে এসে প্রতীক্ষায়,
অহেতুক -

সাড়েসাতটা রাক্ষসফুল হত্যার দণ্ডে দণ্ডিত কোনোএক আত্মা
সন্তপর্ণে পান করছে ব্যক্তিগত আয়ু!
ক্রমশ
ক্রমশ অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতায় তলিয়ে যাচ্ছে ঘরদোর আসমান জমিন
অথবা আস্তএকটা নরকেরপৃথিবী

তাতে তোমার কি, হে রজকিনী

চৌক্ষে আরো আরো আন্ধার ঢেলে দাও, আমি মাতাল হতে এসেছি
আমি মুক্ত হতে এসেছি -

০৫ জুন, ২০২৬

"ভুলে যাওয়া নামের আলো"

একাকি দরজায় কড়া নেড়ে
যায় জোনাক পোকা,
আমি তাকাই না ঠিক—
তবু জানি কেউ একজন
আলো রেখে গেছে বাইরে।

রাত এখানে শব্দের মতো ভারী,
আর দেয়ালের গায়ে জমে
থাকে না বলা সব বাক্য।

জোনাকটা কি সত্যিই জোনাক?
নাকি আমারই ভেতর থেকে ছিটকে আসা--
একটা ছোট্ট অনুতাপ?

দরজার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ে
অদ্ভুত এক নীল নীরবতা—
যেখানে স্মৃতিরা হাঁটে খালি পায়ে।

আমি আলো জ্বালাই না,
কারণ অন্ধকারই এখন
সবচেয়ে সত্যি
আর আলো মানেই
আরও কিছু লুকিয়ে ফেলা।

একাকি দরজায় কড়া নেড়ে
যায় জোনাক পোকা—
বারবার, যেন কেউ ভুলে যাওয়া
নিজের নাম ডেকে যায়।

(সন্দীপনের রাধাচরিতমানস আজ পর্ব তিন !
বেশী বিনয়ে না গিয়ে বলি - যথারীতি, "কি নামালেন ভাই, মালটা এক্কেবারে পাতে দেওয়া যায়না" নাকি "নাহ! চালিয়ে যাও মন্দ নয় " অথবা - "চেষ্টা করো হয়তো একদিন তোমার হবে !" কম সে কম এইসব জানালে বা বললে আমার লিখতে ভালো লাগে কারণ আমার গুরুমশাই দ্বিধাহীন ভাষায় বলে গেছেন - "মানুষের অহংকার পটেই বিশ্বকর্মার বিশ্বশিল্প"- !
আমি আজকের পর্বটা পাঠিকা ও পাঠকের কেমন লাগলো সেটা জানার অপেক্ষায় রইলাম !)

তিন
সন্দীপন নিজের কানকে বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না।
তিনি ঠিক শুনেছেন তো ? কেউ, বা সংক্ষেপে কৃষ্ণকলি সেন আবার কোনো প্রাকটিক্যাল জোক করছে না তো ?

ফোনটা ক্রেডলে রেখে সন্দীপন প্রথমে নিজের গায়ে একটা চিমটি কেটে দেখলেন, নাহ্, স্বপ্ন নয়। প্রয়োজনের চেয়ে জোরে চেঁচিয়ে বলে উঠলেন,"আব্দুল, এক গ্লাস ঠান্ডা জল দে তো আমাকে!"

আজ মঙ্গলবার। গত রবিবার তার শ্রীরাধাচরিতমানস প্রকাশের পর অভিনন্দন পেয়েছেন প্রচুর পাঠক পাঠিকার। কিন্তু যার কঠিন তীক্ষ্ণ সমালোচনার জন্য অপেক্ষা, তার কোনো সাড়া নেই। ক্রমশঃ অধৈর্য্য আর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছিলেন সন্দীপন। আশ্চর্য্য, একে আর যাই হোক, ভাল বলা চলেনা, ভদ্রতা তো নিশ্চয়ই নয়। বুকে মাথায় পায়ে আদিখ্যেতা করে আবির মাখিয়ে তুর্কি নাচন নাচিয়েছে ওই মেয়ে। তিনি ভেবেছিলেন এর পর নিশ্চয়ই সে যোগাযোগ করবে। কমপক্ষে ফোন পাবেন তিনি একটা। বলবেন অনেক জমানো কথা, শুনবেন কৃষ্ণকলির পাকা পাকা বচন। মনে মনে অলীক স্বপ্ন দেখতে শুরু করে ছিলেন সন্দীপন। কিন্তু নাহ্। কোনো রকম সাড়া নেই সেই নিষ্ঠুরা রমণীর দিক থেকে।
দোলের ওই আবির পর্বর পর কেটে গেছে প্রায় পাঁচ দিন। শেষে আজ এই ফোন।

গোপ বালকের ছদ্ম বেশে রাধিকা বিরহ পীড়িত কাণহাইয়ার কাছে গিয়েছিলেন। প্রথমে কৃষ্ণ বিশেষ ভ্রুক্ষেপ করেননি, মৃদু হেসে বালকের আবির স্বীকার করেছেন। কিন্তু, একটু পরে শ্রীরাধিকাই আর নিজেকে সংবরণ করতে পারেন নি। তিনি নিজের অজ্ঞাতেই কখন প্রিয় কানহাইয়াকে সবলে নিজের দিকে আকর্ষণ করে ছিলেন।
কৃষ্ণ যদিও প্রিয় সখীর বিরহে দুঃখিত হয়ে একাকী নিভৃতে ও অন্যমনস্ক বসে ছিলেন, তবু, পরাণসখীর অঙ্গ স্পর্শ মাত্র বুঝে নিতে ক্ষণমাত্র দেরি হয়নি তার। আহ্লাদিনী, অভিমানিনী বালকবেশী শ্রীমতিকে সে দিন নিজের কোলে টেনে নিয়ে দস্যুর মতো রাধার বিপন্ন বাধার ভান একের পর এক চুর্ন করে, বৃন্দাবনের রাখালরাজ রাধার অঙ্গে অঙ্গে নিজের অধিকারের আলপনা একে দিয়েছিলেন। বৃন্দাবন আর লীলা কুঞ্জ রাধাকৃষ্ণর এক নতুন হোলির রঙ্গ দেখেছিল। বৃন্দাবনের আকাশ বাতাস ফাগুয়ার রঙে লালে লাল হয়েছিল, নীল যমুনা উথাল পাথাল হয়েছিল পরমপুরুষ ও পরমা প্রকৃতির অপরূপ লীলা প্রত্যক্ষ করে। সন্ধ্যেবেলা যখন পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছিল, রঙে, রসে, প্রেমে, হরিষে, আবেগে, সুখে, আনন্দে, বৃন্দাবন হয়ে উঠেছিল চিদানন্দের বিমূর্ত অখণ্ড কালাতিত অস্তিত্ব। প্রেমপদ্ সুখায় জগদ্ধিতায়! অখন্ড মন্ডলাকার জগৎসভা সেদিন আনন্দের মহা বিস্ফোরণ দেখে ধন্য হয়েছিল।

কিন্তু এর পর আসছে অবধারিত বিচ্ছেদ। শ্রীকৃষ্ণ জানেন তা, অন্তরে অন্তরে। কিছুই অজানা নেই তার কাছে। এই কাল বা এই যুগ তার কাছে তার নিজের সৃষ্ট মহাকালের একটি ছোট খন্ড মাত্র।
এবার এই প্রেম-বৃন্দাবন ছাড়তে হবে। বৃহৎ ও মহত্তর সহস্রবর্ষব্যাপি অন্য যুগাদর্শ তার দিকে চেয়ে আছে, তাকে এবার "বহুজন হিতায় জগদ্ধিতায়" অবতার ধর্ম পালন করতে হবে। ভারতবর্ষের বুকে জেগে উঠেছে দানব, তারা শক্তির দম্ভে হরণ করতে উদ্যত বিপন্নের অধিকার, তারা রাজা হয়ে রাজধর্ম পালনে অপারগ, তারা শক্তির দম্ভে অন্ধ হয়ে, ভরা রাজসভায় রজঃস্বলা অন্তপুরিকাকে বিবস্ত্র করতে উদ্যত হবে ! বড় বড় রথী, মহারথীরা, ধর্মের নামে, নিয়মের নামে, চাটুকার ক্লীবের মতো, কেঁচোর মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে তা। এবার পরমপুরুষকে সেই ক্লীব-মেধ যজ্ঞে পৌরহিত্য করতে হবে। কংস দিয়ে আরম্ভ, শিশুপাল হয়ে, দূর্যোধন আর তার পঙ্গপালের মত শত ভ্রাতা, শত শত পচে যাওয়া মহাবীর বা মহাবীরের খোলস, ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ, উত্তর দক্ষিণের সহস্র বৎসরের যত আবর্জনা পরিস্কার হবে। কুরুক্ষেত্র ডাকছে, মহাযুগের সন্ধিক্ষণ সমাগত, আকাশে বাতাসে মহানির্ঘোষ উঠবে,
"যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত । অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্ ॥"
পরম পুরুষ বাঁশী ছেড়ে রথচক্র রূপি কালচক্র হাতে নেবেন।
রাধার সাথে প্রেম-বৃন্দাবনে, নীল যমুনায় কালাতিপাতের নির্ঘণ্ট অতিক্রান্ত। কিন্তু সন্দীপন ভেবে পান না, শেষ পর্যায়ের এই চরম বিপ্রতীপ, কঠিন, তীক্ষ্ণ অথচ অনিবার্য ঘটনাটি তিনি কি ভাবে আঁকবেন তার বানিবদ্ধ চিত্রকলায়। তিনি তো শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের মাথুর লিখছেন না যে কেঁদে কেটে এই পর্বের শেষ হবে। তার রাতের ঘুম গেছে, দিনের স্বস্তিও ঠা ঠা দুপুরে মাঠে চরতে গেছে। সেই সময়ে আচমকা অস্থিরমতি সাহিত্য-বিলাসিনি খর-বাদিনী কায়দামতির ফোন!
প্রায় একতরফা ডিক্রি জারি করার মতো করে তিনি যা বললেন, তার মর্মার্থ এই যে, আগামী বুধবার, কলকাতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ডিপার্চার গেট-এ তিনি দয়া করে প্রকট হবেন, সন্দীপন যদি ইচ্ছে করেন, তিনি আসতে পারেন। সময় ডট সাড়ে তিনটে। না আসতে পারলেও কোনো অসুবিধে নেই। কোনপক্ষেই লাভ বা ক্ষতির কোনো সম্ভাবনা নেই।
এই বলে ফোনটা কট করে কাট করে দিতে, হতভম্ব সন্দীপন বলে উঠলেন, "বাপরে, কায়দামতি, তোমার কায়দারও কোনো শেষ নেই !"

তা শেষ অবধি সন্দীপন এসেছেন। দোলাচলে ভুগতে ভুগতে, যাবেন কি যাবেন না ভাবতে ভাবতে নিজের সাথে অজস্র বক্সার আর পানিপথের যুদ্ধ করে তবু তিনি এসেছেন। ঠিক যেমনটা কৃষ্ণকলি বলেছিলেন, সেই মতো ডিপার্চার গেটটির বাইরের স্টিলের রেলিংয়ের একটু কোন ঘেঁষে নিজের মুন্ডপাত করতে করতে দাঁড়িয়েছেন তিনি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিড়ম্বিত সন্দীপন অপেক্ষা করে রইলেন, মূর্খের মতো, সতৃষ্ণ চাতকের মতো, দীন ভিক্ষুকের মত, কোন এক ‘কথার খই ফোটানো’ বাক্যবাগীশ, কে এক অজানা, অচেনা, এমনকি আসল নাম কি, তা অবধি না জানা মেয়ে, কৃষ্ণকলিকে দেখার জন্য।
অস্থির চিত্তে সন্দীপন ঘড়ি দেখছেন বার বার। এক একটি মিনিট যে কত দীর্ঘ্য হতে পারে সন্দীপন আজ হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছেন। কে যে বলেছিল সময় ইলাস্টিক কে জানে, সত্যিই সন্দীপনের মিনিট তো চেবানো চুইং গামের মত বেড়েই যাচ্ছে। এর মধ্যে কতরকম প্যাসেঞ্জার লটবহর নিয়ে গেট পার হয়ে গেলো। গেটে উর্দি পরা জওয়ান দুজনকে পাসপোর্ট, টিকিট দেখিয়ে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে এক এক করে। কিন্তু তাঁর দেখা নেই। যাই হোক, সব দুঃখের রাত্রির ভোর আছে। অবশেষে সন্দীপন দেখলেন যে ঘড়িতে বলছে সাড়ে তিনটে।
ইতিমধ্যে ভেতরে ঢোকার একটা লম্বা মতো কিউ হয়ে গেছে । লাইনে দু চারটে পেটমোটা লোক একহাতে লটবহর ঠেলতে ঠেলতে আরেক হাতে ভুঁড়ির নিচে নেমে যাওয়া প্যান্ট তুলতে তুলতে গেট পার হলো, নেক্সট একটা চারজনের ফ্যামিলি, স্বামী স্ত্রী দুটি বাচ্চা। প্রায় একসাথে, পেছনে, আরেকটি চার পাঁচ জনের ফ্যামিলি। দুজন বয়স্ক দম্পতি, সাথে একজন ভদ্রলোক, সম্ভবত জামাই বা ছেলে, দুটি ইয়াং মহিলা আর একটি বাচ্চা ছেলে। হঠাৎ সেই ফ্যামিলিটির লাইনে দুটি মেয়ের একজনের দিকে চোখ পড়তে তার হার্টবিট এক সেকেন্ডের জন্য বন্ধ হয়ে আবার চলতে শুরু করল। মেয়েটির দৃষ্টি সটান তার মুখের ওপরে। ছোটোখাটো নরমসরম চেহারা। ডাগর বেশ বড় বড় দুটি চোখের পিছনে যেন অনেক কথা আর নীরবতা একসাথে ভিড় করে আখিপল্লবকে আলো-আঁধারিতে স্বপ্নাতুর করে তুলেছে। একটু লম্বা গড়নের মুখে, গালে হালকা হাসির আবেশ, সুস্পষ্ট দ্বিধাহীন ব্যক্তিত্বের সাথে নারীত্বের অমোঘ রহস্যময়তার আভাস চোখে মুখে। চওড়া কপালে বেশ বড় একটা লাল টিপ। সন্দীপনের পা থেকে মাথা অবধি হালকা ইলেকট্রিক শক লাগলো মনে হলো।
কিন্তু না, ইনি তিনি নন। তার দৃষ্টি সন্দীপনের উপর দিয়ে বয়ে গিয়ে ফিরে গেল গেটের সামনে জটলার দিকে। সন্দীপন বুঝলেন তিনি ভুল করেছেন। মেয়েটি সম্ভবত তার সঙ্গিনীর সাথে কোনো কথায় মগ্ন আছে আর তার দৃষ্টি খুব সাধারণ ভাবে সামনের দৃশ্যপটের ওপর দিয়ে বয়েছে, নির্দিষ্ট করে তার ওপর নয়। অথবা, হয়তো তার কোনো পাঠিকা, এখানে দেখে চিনেছে তাকে।
আস্তে আস্তে গেটের দিকে জটলাটা এগিয়ে গেল। লোকজন একে একে পার হয়ে যাচ্ছে এন্ট্রি গেট।
সন্দীপন দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেন লাইনের পেছনের দিকে। দেখতে পেলেন একজনকে, সম্ভবতঃ ইনিই ! খুব স্মার্ট একটি মেয়ে, টাইট জিন্স আর টপে, ঝুঁটি করে বাঁধা চুল, চোখে বেশ বড় চশমা, কাঁধে ব্যাগ সোজা তার দিকে তাকিয়ে। একটু হাসলেন মহিলা, হাত নাড়লেন। সন্দীপন বুঝলেন ইনিই সেই। একটু আশাহত হলেন কি? তিনি তার কৃষ্ণকলিকে ঠিক এরকম দেখতে আশা করেন নি। তিনিও আড়ষ্ট ভাবে হাত নাড়লেন, মৃদু হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটের কোণে।
মেয়েটি একটু কাছাকাছি এলে লাইন থেকেই চেঁচিয়ে বলে উঠলো, 'ওহ্, আপনি সন্দীপন না? দুমিনিট কথা বলা যাবে ?" এই বলে লাইন ছেড়ে বেরিয়ে এলো।
বাকি দু’চারজন তাকিয়ে দেখলো তার দিকে।
বাস্তবিক সন্দীপন একটু অপ্রস্তুত হলেন। তিনি বোধহয় ব্যাপারটার এইরকম পরিণতির জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। মৃদু হেসে তবু আলতো ভাবে জিজ্ঞেস করলেন, "কৃষ্ণকলি?"
মেয়েটি লাইন ভেঙে আরো ভালো করে শোনার জন্য এগিয়ে এলো। আর ব্যাপারটা ঘটলো ঠিক সেই সময়।
সেই ছোটোখাটো দেখতে বড় টিপের মৃদুহাসিনী, যিনি এতক্ষনে বেশ খানিকটা এগিয়ে গিয়ে প্রায় গেটের সামনে পৌঁছে গিয়েছিলেন, গেট থেকেই বেশ চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, সম্ভবত ভেতরে তার সঙ্গী সাথীদের, "তোমরা এগোও, আমি গাড়িতে পার্সটা ফেলে এসেছি !"
বলেই গেট থেকে অ্যাবাউট টার্ন নিলেন। আর এগিয়ে এলেন সোজা তার দিকে। ভেতরে যারা চলে গেছে তাদের পক্ষে আর বাইরে দেখা সম্ভব নয়। কারণ তিনি গেটের সোজাসুজি নেই, একটু কোন ঘেঁষে।
মেয়েটি তিন পা ফেলে সন্দীপনের সামনে এসে দাঁড়ালো। ডান হাতে অক্লেশে বাঁ হাতের ব্যাগটা চালান করে, অনাবিল অসংকোচে বাম হাত দিয়ে সন্দীপনের গলা জড়িয়ে ধরলো আর নিজের দিকে সন্দীপনের মাথা টেনে নিল ! ব্যাপারটা এতো হটাৎ, দ্রুত আর অনায়াস, যে, তিনি প্রতিক্রিয়া জানানোর কোন সুযোগই পেলেন না।
কেবল বুঝলেন একটি পেলব নরম ঠোঁট খুব দ্রুত তার ঠোঁটের উপর আলতো স্পর্শ করে, তারপর কানের কাছে গিয়ে সেই চেনা মিষ্টি গলায় ফিসফিস করলো,"হাঁদুরাম, আমি আপনার কৃষ্ণকলি, ওটা নয়!"
আরো কি বিড়বিড় করে অস্ফুটে, সাহসিনী যে কি বললেন কয়েক সেকেন্ড ধরে, তার কিছুই হতভম্ব সন্দীপনের বোধগম্য হলনা, তিনি খালি বুঝলেন তিনি এখন একটা ভীষণ ইলাস্টিক, অকল্পনীয় নরম, এবং অতিসান্দ্র সময়ের ভিতর ডুবে যাচ্ছেন। ওই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দিয়ে নক্ষত্রবেগে কয়েক আলোকবর্ষ পার হলেন সন্দীপন। মেয়েটির অতিকোমল ঊর্ধ্বাঙ্গ, ঘাড়, গলা, মুখের পাশের দিক তার স্পর্শ পান করছে, এক – দুই - তিন, ব্যাস, খুব সহজ গলায়, যেন কিছুই হয়নি এভাবে নিজেকে ছাড়িয়ে কৃষ্ণকলি একটু উঁচু স্বরে বললেন, "ও মশাই শরীরের যত্ন নেবেন, শুতে বেশি রাত করবেন না, আর ঠিক মতো খাবার খাবেন। বুঝলেন!"
গলা নামিয়ে বললেন, "বুক পকেটে একটা লিস্ট বানিয়ে দিয়েছি, দেখে নেবেন।"
সন্দীপন আবছা অনুভব করলেন, ইতিমধ্যে তার বুক পকেটে একটা ভাঁজ করা কাগজ চলে এসেছে।
এর পর যেন কিছুই হয়নি, এভাবে স্বছন্দ চালে, সিকিউরিটিকে টিকিট আর পাসপোর্ট দেখিয়ে ভিতরে চলে গেলেন। সন্দীপন রেলিং ধরে চিত্রার্পিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন কতকাল কে জানে।
ধাতস্ত হয়ে বাড়ি ফিরে মনে পড়লো কৃষ্ণকলির সেই "লিস্ট" এর কথা। খুললেন, একটা চিঠি। চেনা গেলো, সেই ছোটো ছোটো মেয়েলি ধাঁচে লেখা পত্রখানি।
'প্রিয় লেখক মশাই,
চিঠি যখন পড়বেন, তখন আমি সম্ভবত মাঝ আকাশে, উড়ে যাচ্ছি ইউরোপের কোনো এক দেশে । অন্য কারো, খুব বেশি পরিমানে নিজের কোনো একজনের সংসার সামলাতে।
আপনার কৃষ্ণকলি সে নয়, আপনার কৃষ্ণকলিকে রেখে গেলাম, বৃন্দাবনের নীল যমুনার ধারে, একা বাঁশী হাতে, আপনার বিরহিনী রাই এর মতো। তার কানু তাকে ছেড়ে যান নি, সেই স্বেচ্ছায় তার সাধের কানহাইয়াকে ছেড়ে দিল, যুগপুরুষ কৃষ্ণ হবার জন্যে, সবার জন্যে, অনাগত কালের গুরু দায়িত্বের কথা ভেবে। তার নিজেরও স্বার্থ আছে। এ রাধা মধু-বৃন্দাবনের বাইরে, কারো ঘরণী, সাধারণ এক নারী, যে সকাল সন্ধ্যে সংসার সামলায়, হেঁসেল ঠেলে, স্বামীর পথ চেয়ে থাকে আর সুযোগ মত মায়ের সাথে ফোনে শাশুড়ির শ্রাদ্ধ করে।
সে কৃষ্ণকলি নয়, সে --, থাক, নামটা নাই বা জানলেন। সে অতি সাধারণ এক নারী।
আমাদের দেখা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা ভবিষ্যতে নেই, অন্তত আমি দেখিনা। যদি বা কখনও দৈবাৎ দেখা হয় ও, এক কাপ কফি বা চা এর এপার ওপার থেকে হবে।
শুধু ধন্যবাদ আপনার মরমী মন কে। আপনি ঠিক জানেন, প্রত্যেকটি মেয়ের মধ্যে একজন রাই কমলিনি রাধা থাকে। আজন্ম, আমৃত্যু, সে, সেই নারীর মধ্যে বেঁচে থাকে তার আদরের, স্বপ্নের পুরুষের আদরের ধন হয়ে। সেই কৃষ্ণকলি, কালো বা সাদা নয়, সে শুধু অন্তরে তার কৃষ্ণকালার আদরের রঙ মেখে কুসুমকলির মত ফুটেছে, তাই সে কৃষ্ণের কুসুমকলি, সে কৃষ্ণকলি। সে নারীর প্রেম, হ্লাদীনি শক্তি, সে চিরকিশোরী, সে তার কানুর রাই কমলিনি।
ভালো থাকবেন, জানবেন, কৃষ্ণকলির কড়া নজর আপনার ওপর রইলো। ‘রাধাচরিতমানসে’র দিন ফুরোলো, অন্য কিছু লিখুন, নতুন কিছু। অপেক্ষায় থাকবো।
ইতি আপনার কৃষ্ণকলি ।"
সন্দীপন স্থানু হয়ে বসে রইলেন বেশ কিছুক্ষণ। দোল পেরিয়ে বাতাসে গরম ভাব, দক্ষিণের জানলাটা বন্ধ করতে হবে। খেয়াল হলো, কোকিলের ডাকটা থেমে গেছে কদিন।
অনেক কাজ সামনে। গলার মধ্যে শক্ত গিঁটের মত ব্যথার পিন্ডটা জোর করে গিলে ফেললেন সন্দীপন। এসিটা অন করে, সন্দীপন রাধাচরিত মানসের শেষ অধ্যায়টুকু লিখতে শুরু করলেন-
"শ্রীমতি, কানহাইয়ার দিকে ফিরে এবার বললেন, তুমি আমায় ছেড়ে যাবে কি, দেখ পরমপুরুষ কৃষ্ণ, আমি শ্রীরাধা, এ মধু বৃন্দাবনের অধিশ্বরী, স্বেচ্ছায় তোমাকে মুক্তি দিলাম, বলা ভালো, ত্যাগ করলাম। এই মধু কুঞ্জের বাইরে আমার নিজের জগৎ আছে, স্বামী আছে, সংসার আছে, তাদের দাবি আছে। তোমার সাথে এই বৃথা রঙ্গ রসে দিন কাটালে আমার চলবে না।
দয়া করে আমাকে আর ডেকোনা, কারণ আমি আর সাড়া দেব না। এই কুঞ্জের বাইরে তোমার সাথে আমার সাধারণ আটপৌরে সম্পর্ক ছাড়া আজ থেকে কোনো কিছু রইল না।"
সন্দীপন লেখা শেষ করলেন !
আব্দুলকে ডাকলেন চেঁচিয়ে। বললেন, “আব্দুল, সেই আবিরের রঙ্গ লাগা পাঞ্জাবিটা সামনের লন্ড্রিতে দিয়ে আয়, বাড়িতে রঙ ওঠা মুশকিল।“
গলার মধ্যে যন্ত্রনার ডেলাটা ফের ঝামেলা করছে।
সন্দীপন গলা ঝেড়ে আব্দুল কে বলে উঠলেন," আব্দুল, এক গ্লাস ঠান্ডা জল দিস তো!"